সংবিধান অনুসারে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীসহ সব নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় বৈষম্যবিরোধী আইন করতে যাচ্ছে সরকার। 'বৈষম্যবিরোধী আইন ২০২২' নামে নতুন আইনের খসড়া গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদেও উপস্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে এটি পর্যালোচনার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে রয়েছে। এ পর্যায়ে খসড়া আইনের বিভিন্ন ধারায় আপত্তি জানিয়ে ২০ দফা সুপারিশ করতে যাচ্ছে দেশের তিনটি বেসরকারি সংগঠন ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়।

এগুলো হলো- মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ব্লাস্ট ও নাগরিক উদ্যোগ এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। তাদের সুপারিশমালায় প্রস্তাবিত আইনের নানা অসংগতি তুলে ধরা হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এ আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত করেছে।

আজ বুধবার এ বিষয়ে ঢাকার গুলশানে ব্র্যাক সেন্টারে বিশেষ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় ২০ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন সমকালকে বলেন, 'ব্যক্তি বা ব্যক্তির সঙ্গে শুধু বৈষম্য হয় তা নয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যেও বৈষম্য হয়, সামাজিক ক্ষেত্রেও হয়। এগুলো পর্যালোচনা করে নতুন আইন প্রণয়ন হওয়া দরকার। এসব বিষয় প্রস্তাবিত আইনে প্রতিফলিত হয়নি। এ জন্য আমরা সুপারিশগুলো চূড়ান্ত করেছি এবং তা শিগগিরই সংশ্নিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। আমরা চাই, সত্যিকার অর্থে কার্যকর একটি আইন হোক।'
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, 'সুপারিশগুলো এখনও পাইনি। আইনটিও এখন পর্যন্ত পাস হয়নি। তাই তারা (৪ সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান) বা অন্য কেউ এ আইনের বিষয়ে সুপারিশ দিলে অবশ্যই তা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমরা চাই, বৈষম্যবিরোধী আইনটি দ্রুত পাস হোক।'

চার সংগঠন-প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ :এতে বলা হয়েছে, আইনটি 'বৈষম্য বিলোপ আইন ২০২২' নামে অভিহিত হওয়া উচিত। 'বিরোধী' শব্দটি একটি প্রতিক্রিয়াশীল শব্দ। আইনের শুরুতে বাংলাদেশ সংবিধান ছাড়াও আন্তর্জাতিক সনদ, যেমন- নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত সনদ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সম্পর্কিত সনদ, শিশু অধিকার সনদ, সিডো ইত্যাদি সনদের উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত বিলের ধারা-২ এ বৈষম্যের শিকার প্রত্যেক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংজ্ঞা সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। এখানে শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।

ধারা ৩(ছ) কোন ধরনের পেশা বা ব্যবসা অবৈধ বলে গণ্য হবে, তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। যেমন- যৌনকর্মীর পেশা আইনের মারপ্যাঁচে এখনও বৈধ-অবৈধের মাঝখানে রয়ে গেছে। ধারা ৩(ঘ) এর বিষয়ে বলা হয়েছে, যেসব উপযুক্ত কারণে কোনো শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানানো যাবে বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।

সুপারিশে বলা হয়েছে, আইনের বাস্তবায়ন এবং তার মনিটরিং সহজতর করার জন্য একটি স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন গঠন করার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে, যেখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

এতে বলা হয়েছে, নাগরিক সমাজের বৈষম্য বিলোপ আইনের খসড়া অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বৈষম্য বিলোপ সেল এবং মনিটরিং কমিটির ভূমিকা পালন করতে পারে। ধারা-৪ এর ক্ষেত্রে মনিটরিং কমিটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির এবং লিঙ্গ-বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারী প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের যুক্ত করা প্রয়োজন।

প্রস্তাবিত আইনে বৈষম্যের শিকার ব্যক্তির প্রতিকারপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি। তাই প্রক্রিয়াটিকে সহজতর করা উচিত। প্রস্তাবিত আইনে বৈষম্যমূলক আচরণ বা কাজের ফলে ফৌজদারি প্রতিকারের কোনো বিধান রাখা হয়নি, যা প্রস্তাবিত আইনের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করবে। এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি প্রতিকারের বিধান রাখা প্রয়োজন।

সুপারিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যে ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ প্রতিনিয়ত ঘটে, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে বৈষম্যমূলক আচরণকে 'দণ্ডনীয় অপরাধ' হিসেবে গণ্য করতে হবে।

এ ছাড়াও সুপারিশে আরও রয়েছে, বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে অর্থাৎ মৌলিক অধিকার বা বাস্তবায়নের চেতনা হতে এ আইনটি করা হয়েছে। মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে যেসব অধিকারের কথা বলা হয়েছে, তা আদালতের মাধ্যমে প্রতিকারযোগ্য। তাই বৈষম্যবিরোধী প্রস্তাবিত আইনের অধীনে অধিকার ভঙ্গ করা হলে বা বৈষম্যমূলক আচরণ করা হলে, তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা প্রয়োজন এবং আদালতের মাধ্যমে বিচারযোগ্য করা প্রয়োজন। অভিযোগ দায়ের করার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক প্রতিকারের পাশাপাশি বিচারিক প্রতিকারের ব্যবস্থাও সংযুক্ত করা প্রয়োজন। আইনটি পাস হওয়ার পর এর বিধিমালা দ্রুত প্রণয়নের ব্যবস্থা করা দরকার।