ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

হাওরে বাঁধ ভাঙার ভয়

হাওরে বাঁধ ভাঙার ভয়

নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুরে শেষ মুহূর্তে চলছে ফসল রক্ষা বাঁধের সংস্কারকাজ। বৃহস্পতিবারের ছবি খলিলুর রহমান শেখ

 জাহিদুর রহমান, ঢাকা; পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ ও মোস্তফা কামাল, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪ | ০০:৫৭

হাওরকে বলা হয় ফসলের ‘গোলাঘর’। সেই হাওরের ফসলেই বারবার আছড়ে পড়ে বানের জল। নড়বড়ে বাঁধের কারণে প্রতিবছরই কৃষক থাকে দুশ্চিন্তায়। ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে হেলাফেলা আর অনিয়মের খবরাখবর উঠে আসে গণমাধ্যমে। তবু বদলায় না ছবি। এবারও সেই পুরোনো প্রতিচ্ছবি। শুরুতে ঢিলেঢালা আর শেষে তাড়াহুড়োর পুরোনো চক্রে আটকে আছে হাওরে বাঁধ নির্মাণ। হাওরাঞ্চলে নির্ধারিত ৭৫ দিনেও শেষ হয়নি ফসল রক্ষা বাঁধের নির্মাণকাজ। এ পরিস্থিতিতে কৃষকের মাথার ওপর বৃষ্টির খড়্গ। আগামী রোববার দেশের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি ঝরতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় আগাম বন্যার ভয় কৃষকমনে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারার কারণ হিসেবে জাতীয় নির্বাচন এবং অসময়ের বৃষ্টিকে দুষছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে তাদের এমন ছুতাকে গা বাঁচানোর চেষ্টা বলছে ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন কমিটি’। বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।

গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার নীতিমালা অনুযায়ী, এসব ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ গত ১৫ ডিসেম্বর শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা। পাউবো কর্মকর্তারাও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, এ পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৮৭ শতাংশ। বাকি কাজ শেষ করতে আরও সাত দিন সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। তবে হাওর বাঁচাও আন্দোলন নেতাদের দাবি, কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৫ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়েছে। যার ওপর নির্ভরশীল জেলার প্রায় চার লাখ কৃষকের জীবন-জীবিকা। এ বছর ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধের মধ্যে ৫৮১ কিলোমিটার বাঁধে ৭৪১টি পিআইসির মাধ্যমে ১২৬ কোটি টাকার মাটির কাজ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৭ সালে হাওরে ব্যাপক ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তখন পাউবোর ঠিকাদারের কাছ থেকে বাঁধ নির্মাণের ভার চলে যায় কৃষক ও সুবিধাভোগীদের হাতে। তাদের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য পাঁচ থেকে সাত সদস্যের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) থাকে। একটি পিআইসি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারে। কিছুসংখ্যক ঠিকাদারের বদলে এর সুবিধাভোগী এখন কয়েকশ কৃষক। পিআইসির গোটা প্রকল্পের জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক আর সদস্য সচিব পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী। 

নিয়ম অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প নির্ধারণ ও পিআইসি গঠন করতে হয়। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু করে শেষ করতে হয় ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। তবে দেখা যাচ্ছে, কোনো বছরই এ নিয়ম মানা হয় না। প্রতিবছর গড়িমসি করতে করতে কাজের ইতি টানা হয় মার্চের শেষে। যদিও এবার নির্বাচনের অজুহাত দেখানো হচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, পিআইসি গঠন ও প্রকল্প পাওয়ার বিষয়টি এখন রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে। অসাধু কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে সাধারণ কৃষক। গোটা বিষয়টি বিতর্কিত করে বাঁধ নির্মাণের কাজকে আবারও ঠিকাদারদের হাতে তুলে দেওয়ার ধারাবাহিক চক্রান্তও চলছে বলে অনেকে মনে করেন।

দুশ্চিন্তায় কৃষক
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, গুরমার হাওরে এখনও বাঁধের কাজ অসম্পূর্ণ। মাটিয়ান হাওরের বোয়ালমারা বাঁধের ৬০, ৬১ ও ৬২ নম্বর প্রকল্প, বর্ধিত গুরমার হাওরের ১৪ নম্বর প্রকল্প এবং শনির হাওরের ২৬, ৩৪, ৪৫ ও ৭৭ নম্বর প্রকল্পের কাজ এখনও শেষ হয়নি। এসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কাজ শেষ করতে না পারার পেছনে বৃষ্টি, কার্যাদেশ দেরিতে পাওয়াসহ নানা অজুহাত সামনে আনছেন।

তাহিরপুরের বড়দল গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, পাহাড়ি ঢল যাদুকাটা নদী দিয়ে নামলে প্রথম আঘাত হয় বড়দল-কাউকান্দি এলাকার মাটিয়ান হাওরের বাঁধে। বড়দল-কাউকান্দি এলাকার এসব বাঁধের মাটির কাজ এখনও শেষ হয়নি।

সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, মাঝখানে বৃষ্টি হওয়ায় কোনো কোনো হাওরে কাজে সমস্যা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি কাজ শেষ করা সম্ভব।
নেত্রকোনার খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, বারহাট্টা, আটপাড়ায় রয়েছে ছোট-বড় ১৩৪ হাওর। এর মধ্যে খালিয়াজুরীতে ৮৯টি হাওর রয়েছে। আর এখানে রয়েছে ১৮০ কিলোমিটার ডুবন্ত অস্থায়ী বাঁধ। এর মধ্যে ১১০ প্রকল্পের মাধ্যমে ৯২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার করা হচ্ছে। মোহনগঞ্জের কীর্তনখোলা হাওরের একাধিক কৃষক বলেন, তারা ঋণ নিয়ে বোরোর আবাদ করছেন। বাঁধের কাজ এ বছর ঠিক সময়ে শুরু হয়নি। এ কারণে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। আগাম বন্যার পানিতে ফসল নষ্ট হলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।
খালিয়াজুরী হাওর রক্ষা পরিষদের সভাপতি স্বাগত সরকার শুভ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের কারণে এবার স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি অনেকটা কম ছিল। ফলে বাঁধের কাজের তেমন অগ্রগতি হয়নি। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে পুরো হাওরের বোরো ফসল হুমকিতে পড়বে।

খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক মো. আমির উদ্দিন বাড়ির সামনের হাওরে তিন একর জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছেন। তিনি বলছিলেন, ‘হেরা যেইবায় কাম করতাছে, বান্দের কাম শেষ করলেও মাটি শক্তপোক্ত অইত না। ঢল আইলে ঠেলা দিয়া ভাইঙ্গাচুইরা লইয়া যাইবগা। আরও এক মাসেও কাম শেষ করতে পারে কিনা সন্দেহ আছে।’ একই গ্রামের কৃষক জমির মিয়া বলেন, ‘ক্ষেত করছি ঋণ-দাওর কইরা। সরকার তো ঠিক সময়েই ভালোমতন কাম শেষ কইর‌্যা আমরার ফসল বাঁচানোর জন্য ট্যাহা দিছে। সরকারে ঠিকই খরচ করতাছে আমরার লাইগ্যা। কিন্তু প্রকল্পের লোকজন আর প্রশাসনের লোকজন যদি ঢিলামি করে, তাইলে আমরা বাঁচবাম কেমনে?’

বাঁধের ব্যবসা করতেই স্থায়ী কাজ হয় না
সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের প্রবীণ সাংবাদিক স্বপন কুমার বর্মণ বলেন, প্রয়াত স্থানীয় সংসদ সদস্য ফজলুল হক আসপিয়া একসময় সুনামগঞ্জে স্থায়ী বাঁধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এখানে বছরে বছরে দুর্বল বাঁধ দিয়ে সরকারি টাকার অপচয় করার প্রয়োজন নেই। এরপর তিনি আর এমপি ছিলেন না; স্থায়ী বাঁধও পরে আর হয়নি। বছর বছর এই বাঁধে কোটি কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। প্রতিবারই বাঁধটি ভাঙার উপক্রম হয়। স্থানীয় কৃষকরা লড়াই করে সেটি টিকিয়ে রাখেন। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে কৃষকরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও টিকিয়ে রাখতে পারেননি বাঁধ। ডুবেছে বিশাল করচার হাওর। এবারও যেভাবে বাঁধের কাজ হয়েছে, নদীতে পাহাড়ি ঢল নামলে বাঁধ টিকবে না।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এ বাঁধ কৃষকদের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ব্যবসার পথ তৈরি করে। আগে ছিল ঠিকাদারদের ব্যবসা ক্ষেত্র। এখন পিআইসির (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির) নামে, অর্থাৎ সামর্থ্যহীন কৃষকের নামে প্রভাবশালীদের ব্যবসা ক্ষেত্র।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, এবার সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ৩৮ হাওরে ৫৯১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ করছে পাউবো। এতে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ৭৩৫টি। প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ১২৫ কোটি টাকা। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের দাবি, এখন পর্যন্ত ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। এক সপ্তাহ বা ১৫ দিনে এই কাজ শেষ করা সম্ভব নয়।

সুনামগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি এনাম আহমদ বলেন, কয়েক বছর আগে ঠিকাদারিপ্রথার সময় অফিসে বসেই কাগুজে-ফাইলে বাঁধের কাজ করে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা লোপাট হতো। কৃষকের ফসল ছেড়ে দেওয়া হতো প্রকৃতির ওপর। প্রকৃতির মমতার ওপরই কৃষকের ভাগ্য নির্ধারিত হতো। এখন কৃষকের নাম ব্যবহার করে টাকা লোপাট হচ্ছে। বাঁধের ব্যবসা করার জন্য প্রয়োজন ছাড়াও বরাদ্দ হচ্ছে। আবার জরুরি বাঁধ যথাসময়ে হচ্ছে না। অন্তত ২০০ কিলোমিটার হাওর রক্ষা বাঁধ আছে, যেখানে স্থায়ীভাবে বাঁধ দেওয়া যায়। সেখানেও ডুবন্ত বাঁধ দিয়ে কোটি কোটি টাকা পকেটে তোলা হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নে এমপির পছন্দের লোক
প্রতিটি বাঁধের জন্য একটি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠনের নিয়ম রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) এসব কমিটির উপদেষ্টা থাকলেও কিশোরগঞ্জে এমপির পছন্দের লোকদের নিয়েই পিআইসি গঠন করা হয়। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত সব প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের মাত্র ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ টাকা বরাদ্দ এসেছে বলে পাউবো সূত্রে জানা গেছে। পিআইসি গঠন দেরি হওয়ার কারণে এখন পর্যন্ত ৭৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা গেছে বলে জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান। 

হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো বাঁধের বিভিন্ন অংশে শক্ত মাটির বদলে বালু দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। এসব জায়গায় দু’পাশের জমিতে বালু থাকায় এমনটি হয়েছে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
এবার ৯ উপজেলায় ১২৪টি বাঁধের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যার মোট দৈর্ঘ্য ১৪১ দশমিক ৯৭৮ কিলোমিটার। পিআইসির মাধ্যমেই এসব কাজ করানো হচ্ছে। মিঠামইনের গোপদীঘি ইউনিয়নের মুশুরিয়া-হাসানপুর বাঁধের পিআইসি সভাপতি নূরুল হক ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তাঁর কাজও অনেকটা বাকি। কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর কাজ শুরু করতে হয়েছে। এলাকার এমপি রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক নির্বাচনের জন্য সময় দিতে পারেননি বলে পিআইসি গঠন দেরি হয়েছে; কাজও কালক্ষেপণ হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। 
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান বলেন, বাঁধের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর দু’পাশে ঘাস লাগানোর কাজ থাকে, যেন বৃষ্টিতে মাটি কেটে না যায়। এবার বাঁধের কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় ঘাস লাগানোর কাজও পিছিয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টি হলে প্রায় সব বাঁধই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থাকবে। 

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেন, দু-একটি জায়গায় পানি নিষ্কাশনের সমস্যা হয়েছিল, দেরিতে পানি নেমেছে। এ কারণে আমাদের কাজ কিছুটা দেরি হতে পারে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ যে পয়েন্টগুলো রয়েছে, সবই বাঁধ মেরামতের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কাজ বাস্তবায়নে গাফিলতি বা দুর্নীতির আশ্রয় নিলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব।

 

আরও পড়ুন

×