ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

মৃত্যুদূত যখন গ্যাস সিলিন্ডার

মৃত্যুদূত যখন গ্যাস সিলিন্ডার

.

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪ | ২৩:১১ | আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৪ | ০৭:০৪

প্রাকৃতিক গ্যাসের সীমাবদ্ধতায় দেশজুড়ে রান্নার কাজে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এলপিজি (তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস)। সিলিন্ডার গ্যাস নামে বহুল ব্যবহৃত এই জ্বালানিটি যেমন সহজলভ্য, তেমনি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে দিন দিন। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের খবর আসছে। অধিকাংশ দুর্ঘটনায় সিলিন্ডার সরাসরি বিস্ফোরিত না হলেও লিকেজ হওয়া গ্যাস থেকে ঘটছে অগ্নিকাণ্ড। 

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বেইলি রোডের একটি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রথমে ছোট আকারে আগুন লেগেছিল, পরে তিন-চারটি বিকট শব্দে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মতে, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বা তা থেকে বের হওয়া গ্যাস বিস্ফোরণে অগ্নিকাণ্ড ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। 

গত ২৪ জানুয়ারি নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ছেড়ে দেওয়া গ্যাসের অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ১১ ডিসেম্বর গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি টেক্সটাইল মিলে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এভাবে  অসচেতনতা এবং অব্যবস্থপনার কারণে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনায় নিয়মিত হতাহতের ঘটনা ঘটছেই। 

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত ২৩০ দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত হয়েছে। সিলিন্ডার গ্যাসের পাশাপাশি পাইপলাইনের লিকেজ গ্যাস থেকে প্রায়শই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। ২০২১ সালের ২৭ জুন মগবাজারের একটি ভবনে তিতাসের পাইপের লিকেজ থেকে বের হওয়া গ্যাসের বিস্ফোরণে ১২ জন মারা যায়। এর আগে ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদে এ ধরনের বিস্ফোরণে ৩৪ জন মারা যায়। 

কেন সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কারিগরি ত্রুটি, অসচেতনতা ও অসতর্কতার ফলে সিলিন্ডার দুর্ঘটনা ঘটছে। দিনে দিনে তা বেড়েই চলেছে। রান্নার কাজকে সহজ করতে নিয়ে আসা সিলিন্ডার যেন মৃত্যুদূতে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এই দুর্ঘটনা রোধে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জোরালো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। 

বারবার সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সাবেক একজন প্রধান পরিদর্শক বলেন, সাধারণ সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয় না। বিস্ফোরণ ঘটে সিলিন্ডারের অন্য যন্ত্রাংশে। রেগুলেটরসহ অন্যান্য যেসব যন্ত্রাংশ বাজারে পাওয়া যায় তার অধিকাংশই নিম্নমানের। এ ছাড়া সিলিন্ডার রাখা হয় চুলার একদম কাছে। সিলিন্ডার পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণে তেমন নিয়ম মানা হয় না। ব্যবহারের পর ঠিকমতো বন্ধও করা হয় না। ফলে গ্যাস লিকেজ হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বড় কোম্পানির সিলিন্ডার ও গ্যাস কিনে অবৈধ উপায়ে নিম্নমানের সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল করা হয়। এসব সিলিন্ডার নিরাপদ নয়। 

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. ইয়াছির আরাফাত খান বলেন, সাধারণত এলপিজি গ্যাস ২ শতাংশ ও লাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস ৫ শতাংশ বাতাসের সংস্পর্শে এলেই তা বিস্ফোরণ সম্ভাবনা তৈরি করে। লাইন গ্যাসের চেয়ে ১০-১২ গুণ চাপ কম থাকে সিলিন্ডার গ্যাসে। ফলে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হলে ক্ষয়ক্ষতি খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। তবুও দেশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে– বিস্ফোরণ হলেও সিলিন্ডার কিন্তু অক্ষত থাকছে। 

তিনি বলেন, গৃহস্থালির বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটছে গ্যাস লিকেজ থেকে। মূলত সিলিন্ডার থেকে কানেক্টিং পাইপ, চুলার রাবার কিংবা রেগুলেটরের ত্রুটি থেকে গ্যাস লিকেজ হচ্ছে। তা হয়তো বদ্ধঘরে জমা হচ্ছে। এক পর্যায়ে বৈদ্যুতিক স্পার্ক বা কোনোভাবে আগুন লেগে বিস্ফোরণ ঘটছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, বেশির ভাগ সবার আগে মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে কোনো সংস্থার মাধ্যমে একটা স্ট্যান্ডার্ড করতে হবে। সেই স্ট্যান্ডার্ড মানছে কিনা তা কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে। সিলিন্ডার ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সিলিন্ডারের সঙ্গে তা ব্যবহারের নিয়মকানুন ও প্রয়োজনীয় সতর্কতাসংবলিত লিফলেট বিতরণ করবে।

আরও পড়ুন

×