ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

একেকটি বাণিজ্যিক কিচেন যেন একেকটি টাইম বোমা

বিশেষ লেখা

একেকটি বাণিজ্যিক কিচেন যেন একেকটি টাইম বোমা

ইকবাল হাবিব

ইকবাল হাবিব

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪ | ২৩:১৫ | আপডেট: ০২ মার্চ ২০২৪ | ০৭:৪৪

বেইলি রোডে আগুনে প্রাণহানির পুরো বিষয় একটি অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে রাজধানীতে বারবার। অথচ কেউ কিছুই করছে না। সেবা সংস্থাগুলো যেমন তিতাস কিংবা যারা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানকারী বিভাগের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি এসওআর জারি করা আছে। সেখানে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে– কমপ্লায়েন্স না থাকলে এ ধরনের কার্যক্রম চলতে দেওয়া যাবে না। 

রাজধানীতে এ ধরনের অনেক ভবনে বাতাস আদান-প্রদানের কোনো সুযোগ থাকে না। ফায়ার এস্কেপগুলোতে গ্যাসের সিলিন্ডারগুলো খাড়া করা থাকে। দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারে না। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা যায়। এবারের মৃত্যুর পর বলতে চাই– রানা প্লাজায় দুর্ঘটনার পর যেভাবে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম,  সেভাবে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে পারি। তারা ভবনগুলো জরিপ করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তাহলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। 

তবে মুশকিল হচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পরই আমরা সব ভুলে যাব। আরেকটি দুর্ঘটনার জন্য অপেক্ষা করব। আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটবে। বেইলি রোড ও ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে দেখা যাবে, এ রকম অনেক রেস্টুরেন্ট গজিয়ে উঠেছে। সেগুলো সাধারণ কিচেন না। বাণিজ্যিক কিচেনের নিয়মকানুনের একটিও সেখানে প্রতিপালিত হয় না। অথচ অনেকেরই কোনো না কোনো রকম সার্টিফিকেশন রয়েছে। এটি অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের কেন্দ্র তৈরি করে ফেলেছে। একেকটি ভবন যেন একেকটি টাইম বোমা।

এসব রেস্টুরেন্ট তদারকির জন্য ছয়টি সংস্থা রয়েছে। তবে এত সংস্থা থাকার পরও কেউ দায় নেয় না। ফায়ার সার্ভিস, রাজউক, তিতাস, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হয়। সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনও থাকে না। নিলেও নবায়ন না করার কারণে পরের বছরই এক ধরনের বৈকল্যের মধ্যে চলে যায়। 

রাজধানীর ৯০ শতাংশের বেশি রেস্টুরেন্টই অনুমোদনহীন। তারপরও কেন রেস্টুরেন্ট বাড়ছে? কারণ খেলার জায়গা, পার্ক নেই; ঘোরার জায়গা নেই। কোনো উন্মুক্ত স্থান না থাকায় বিনোদনের একমাত্র জায়গা রেস্টুরেন্ট। তারা বাণিজ্যিক কিচেনের নামে টাইম বোমা বানিয়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। 

২০২১ সালে মগবাজারে হুবহু একই ঘটনা ঘটেছিল; একটি শর্মার দোকানে। এমন বিস্ফোরণ ঘটেছিল; পাশে থাকা বাসের ড্রাইভার ও যাত্রী নিহত হয়েছিলেন। বেইলি রোডের সঙ্গে সেই দুর্ঘটনাস্থলের দূরত্ব বেশি নয়। সব সংস্থার দায় এড়ানোর মধ্য দিয়ে এ রকম আরেকটি অবহেলাজনিত মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি। 
বাংলাদেশ এ রকম একটা দেশ, যেখানে অন্তত আট মাস এসি ছাড়া চলা যায়। তাহলে কাচ-ঘেরা দমবন্ধ ভবন কেন এত তৈরি করা লাগবে? টাস্কফোর্সের মাধ্যমে এগুলো চিহ্নিত করা হোক। তিন মাস বা ছয় মাসের মধ্যে এটা করা গেলে হয়তো সামান্যতম হলেও সন্তানদের জন্য নিরাপদ শহর রেখে যেতে পারব। আবাসিক ভবনে এভাবে বাণিজ্যিক কিচেন চলতে পারে না। এগুলো টাইম বোমার মতো বসে আছে। 

লেখক : পরিবেশ আন্দোলনকর্মী, স্থপতি ও নগর গবেষক

আরও পড়ুন

×