ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

নারীর গৃহস্থালির শ্রম এখনও উপেক্ষিত

নারীর গৃহস্থালির শ্রম এখনও উপেক্ষিত

.

 সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪ | ২৩:৩৯

নারীর কাজ শুনলেই সবার মনে প্রথমেই আসে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ছবি। কিন্তু ইট ভাঙা, মাটি কাটা, কৃষিকাজ, শিল্পকারখানায় কাজ, শিক্ষকতা, চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী, গবেষক, পাইলট, গাড়িচালক, চা দোকানদার থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারী, পুলিশ-সেনাবাহিনী– এমন বহু পেশায় নারীরা এখন এগিয়ে আসছেন সমানতালে। তবে সবকিছুর পরও নারীর যে 
পেশা আজও স্বীকৃতি পায়নি তা হলো গৃহস্থালি কাজ। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চল এবং প্রত্যন্ত গ্রামের বহু নারী একাই উপার্জন করে যেমন সংসার চালাচ্ছেন, তেমনি তাদের করতে হচ্ছে গৃহস্থালির কাজও। সবাই তাদের প্রথাগত পেশা দেখলেও উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে গৃহস্থালির শ্রম। 

বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, মজুরিবিহীন কাজে পুরুষের চেয়ে নারীর অংশগ্রহণ দিনে ৬.৪৬ ঘণ্টা বেশি। ২০১২ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরোর টাইম ইউজড সার্ভে রিপোর্টে বলা হয়, ১৫ বছরের বেশি কর্মজীবীদের মধ্যে ঘরের বিভিন্ন কাজে পুরুষ দৈনিক ১.৪ ঘণ্টা এবং নারী ব্যয় করেন ৩.৬ ঘণ্টা। কর্মজীবী না হলে গড়ে নারীরা দিনে ৬.২ ঘণ্টা এবং পুরুষ ১.২ ঘণ্টা এ ধরনের কাজে ব্যয় করেন। এর পরের রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও নিশ্চয়ই এর খুব একটা তারতম্য হবে না। কিন্তু উপকূলের নারী শ্রমিকদের কোনো তথ্য কারও কাছে নেই।

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর কোলঘেঁষা প্রত্যন্ত গ্রাম চরলাঠিমারা। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে মাছ ধরে। উল্লেখযোগ্য হলো, এখানকার মৎসজীবীদের মধ্যে এমন বহু নারীকে খুঁজে পাওয়া যায়, যারা তাদের সংসারের প্রধান উপার্জনক্ষম। তাদের কেউ বিধবা, কাউকে স্বামী ছেড়ে চলে গেছে, কারওবা স্বামী নিরুদ্দেশ। জীবনযুদ্ধে তবু তারা হার মানেননি। নারী 
দিবস, নারী অধিকার নিয়েও তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এই নারীদের শুধু একটাই যেন চাওয়া, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে সন্তান-সন্ততির মুখে ভাত তুলে দেওয়া এবং তাদের মুখে একটু হাসি দেখা। 
চরলাঠিমারা গ্রামে কথা হয় এমনই এক নারী নুরজাহান বেগমের সঙ্গে। জন্মের পর থেকে নুরজাহান তাঁর বাবার বাড়িতে যে অভাব দেখেছিলেন, এখন একই অবস্থা নিজের সংসারেও। স্বামী হাশেম খান মারা গেছেন অনেক আগে। তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে বড় করতে তাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সংসারের হাল। নুরজাহান জানান, দীর্ঘ ৩৮ বছর মাছ ধরে 
সংসার চালাচ্ছেন। 

নুরজাহানের মতো মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন আকলিমা বেগম, রওশন আরা, হালিমা ও বিউটি বেগমের মতো অসংখ্য নারী। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চরলাঠিমারা 
সংরক্ষিত বনের ছোট ছোট খালে তারা মাছ ধরেন। সে মাছ বিক্রি করে প্রতিদিন উপার্জন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা; যা দিয়ে চলে তাদের সংসার। অবস্থা এমনই যে, একদিন মাছ ধরতে না পারলে অনেকের ঘরে চুলা জ্বলে না। কথা হয় রওশন আরার সঙ্গে। তাঁর স্বামী মারা গেছেন আট বছর আগে। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে অতি কষ্টে দিনযাপন করছেন। রওশন বলেন, ‘মোগো ধানের জমি নাই। মাছ ধইরাই সংসার চালাই। বিধবা বা বয়স্ক ভাতাও পাই না।

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘উপকূলের নারীরা যেভাবে সংসারের হাল ধরছেন সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে নারীদের সরকারি সহায়তার মাধ্যমে এসব কাজে আরও উদ্যোগী করা প্রয়োজন। কারণ এরাই অর্থনীতি চাঙ্গা করার মূল হাতিয়ার। উপকূলে নারী জেলে শ্রমিক রয়েছেন– এমন তথ্য সরকারের কাছে নেই। তাদের নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।’ 
মহিলা পরিষদের পাথরঘাটা শাখার সাধারণ সম্পাদক নারী নেত্রী মুনিরা ইয়াসমিন খুশি বলেন, ‘নারীরা যেসব কাজে এগিয়ে, তা দেখতে হলে এখানে আসতে হবে। দেশের সামগ্রিক নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসব নারী অংশীদার। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এসব নারীকে বিনা সুদে ঋণ সহায়তা দেওয়া উচিত।’
 

আরও পড়ুন

×