আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, জনগণের দল আওয়ামী লীগ জনগণের শান্তি ও জনগণের শক্তিতে বিশ্বাসী। জনগণ ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে আওয়ামী লীগ দেশগড়ার জাতীয় দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। যদি বিজয়ী না করে, তাহলে আমরা জনগণের কাতারে চলে যাব। তবে যেখানেই থাকি, আমরা জনগণের সেবা করে যাব।

আন্দোলনের নামে ধ্বংসাত্মক অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ষড়যন্ত্র করে কেউ যাতে জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, সেদিকে সবার সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। একই সঙ্গে কেউ যাতে আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করে মানুষের জানমাল ও জীবিকার ক্ষতিসাধন করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

গতকাল শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা তাঁর সরকারের বর্তমান মেয়াদের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে এই ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। ভাষণটি শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও স্টেশনগুলো একযোগে সম্প্রচার করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছরের শেষে অথবা সামনের বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচন হবে। তবে এখন থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী, ক্ষমতালোভী, জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারী আর পরগাছা গোষ্ঠীর সরব তৎপরতা শুরু হয়েছে। এদের লক্ষ্য ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে পেছনের দরজা দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা।

দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, এরা লুণ্ঠন করা অর্থ দিয়ে দেশে-বিদেশে ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী এবং বিবৃতিজীবী নিয়োগ করেছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরা মিথ্যা এবং ভুয়া তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এদের মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হবেন না। আর গণতন্ত্র ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুরোধ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়- এমন কোনো উদ্ভট ধারণাকে প্রশ্রয় দেবেন না, ইন্ধন জোগাবেন না। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাঁর সরকারের সদিচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য দেশে এই প্রথম একটি আইন পাস করা হয়েছে। সেই আইনের আওতায় সার্চ কমিটি করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে আর্থিক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে, ভবিষ্যতেও করবে। সরকার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে যাবে।

ভাষণের শুরুতে বর্তমান মেয়াদে সরকার গঠনের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশবাসী ও প্রবাসীদের শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৪ বছর আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এই ১৪ বছরে আমরা দেশ ও দেশের জনগণকে কী দিতে পেরেছি- এর বিচার-বিশ্নেষণ দেশবাসীই করবেন। তবে বর্ষপূর্তিতে আমি শুধু কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করে আপনাদের স্মৃতিকে নাড়া দিতে চাই।

গত ১৪ বছরে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি ও জনগণের সার্বিক কল্যাণে তাঁর সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা রূপকল্প ২০২১-এ অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলাম। আজ সন্তুষ্টচিত্তে বলতে পারি, সে প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম হয়েছি। রূপকল্প ২০২১-এর পর রূপকল্প ২০৪১ এবং বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রণয়ন করেছি। রূপকল্প-২০৪১ এর লক্ষ্য হচ্ছে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করা। বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর লক্ষ্য হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে একটি টেকসই উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে হিসেবে টিকিয়ে রাখা।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাসহ এদেশের মহৎ ও বৃহৎ অর্জনগুলো আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ সরকারের হাত ধরেই অর্জিত হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলের জঙ্গি-সন্ত্রাস, হত্যা-খুন, দুর্নীতি-লুটপাট এবং অর্থ পাচারসহ দুঃশাসনের বিবরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০১ সালের প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসে। বিএনপি-জামায়াত সরকারের ওই পাঁচ বছর ছিল দেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।

সরকারপ্রধান বলেন, মেয়াদ শেষে নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে স্বাভাবিক ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। ভোটার তালিকায় এক কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার ষড়যন্ত্র করে। দলীয় রাষ্ট্রপতিকেই প্রধান উপদেষ্টার পদ দিয়ে সরকার গঠন করে ৬ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে প্রহসনের উদ্যোগ নেয়। জনগণ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এমনি এক অরাজক পরিস্থিতির মুখে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারাও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে শুধু ব্যর্থই হয়নি, নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কালিমালিপ্ত করে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সরকার ছবিসহ একটি সুষ্ঠু ভোটার তালিকা তৈরি এবং স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সংস্কার সম্পন্ন করে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।

বিভিন্ন আর্থসামাজিক সূচকের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষ অর্থবছরের সঙ্গে বর্তমানে দেশের অবস্থানের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও মন্দা সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের প্রচেষ্টাগুলোও তুলে ধরেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, গত ১৪ বছরে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে। বাংলাদেশকে আজ আর কেউ বন্যা, খরা, দুর্যোগের দেশ হিসেবে দেখে না। বাংলাদেশ এখন উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। উন্নয়নের রোল মডেল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। জাতিসংঘসহ দুই ডজনেরও বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠনে বাংলাদেশ সক্রিয় সদস্য। গত অক্টোবরে পঞ্চমবারের মতো বিপুল ভোটে বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমানা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহলবাসীর ৬৮ বছরের বন্দি জীবনের অবসান হয়েছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার শান্তিপূর্ণ মীমাংসার মাধ্যমে আমরা বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকার ওপর সার্বভৌম অধিকার অর্জন করেছি। আমরা ১২ লাখের মতো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি।

সরকারপ্রধান বলেন, আমাদের দেশ এগিয়েছে অনেক। তবে আরও এগিয়ে নিতে হবে। একটি উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ অর্জন আমাদের লক্ষ্য। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পর আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য হচ্ছে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নানা অনুষঙ্গ ধারণ করে আমরা তরুণদের প্রশিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শোষণ-বঞ্চনামুক্ত একটি সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্টম্ন দেখেছিলেন। আসুন, স্মার্ট দেশ গড়ার মাধ্যমে একটি সুখী-সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলে আমরা তাঁর স্বপ্টম্ন বাস্তবায়ন করি। এ দেশের সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাই।

ভাষণের শেষ ভাগে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার উদ্ৃব্দতি দিয়ে তিনি বলেন, যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক'রে যাব আমি-/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।