বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং সংবাদমাধ্যমের নেতৃবৃন্দ মানবাধিকার সুরক্ষা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করার জন্য পরস্পরের সহযোগিতাকে জোরদার করার পক্ষে বলেছেন রাজধানীতে এক সেমিনারে। তাঁরা বলেন, দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, তবে মানবাধিকার রক্ষায় তাঁদের অবদান রাখার শর্ত হলো, উভয়কে স্ব স্ব এখতিয়ারে নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাধাগুলো দূর করতে হবে।

'মানবাধিকার সুরক্ষায় গণমানুষের প্রত্যাশা: গণমাধ্যম ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সমন্বিত প্রয়াস' শীর্ষক সেমিনারটি মঙ্গলবার একটি হোটেলে আয়োজন করে কমিশন। ২০০৯ সালে জাতীয় কমিশনটি বর্তমান রূপে গঠনের পরে এ ধরনের একটি খোলামেলা বড় সেমিনার এই প্রথম। গত ডিসেম্বরে কমিশনের ষষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক সচিব ড. কামালউদ্দিন আহমেদ।

কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য মো. সেলিম রেজার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন। শুরুতে কমিশনের পরিচিতি ও কার্যক্রম তুলে ধরেন পরিচালক কাজী আরফান আশিক।

বক্তারা বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের যদি কাজ হয় শুধু পরিদর্শন ও সুপারিশ করা, তবে এই কমিশন থাকার দরকার কী। কমিশনপ্রধানের নেতৃত্বের গুণে প্রতিষ্ঠানটি অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠান হয়ে ঘুমিয়ে থাকা কমিশন জনগণ চায় না।

মূল প্রবন্ধে কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গণমাধ্যমের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় হওয়া দরকার। তিনি বলেন, কমিশন 'ওয়াচডগ' হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। কমিশনের পাশে শক্তিশালী গণমাধ্যম থাকতে হবে। তাতে মানবাধিকার কমিশন গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারবে।

আলোচনা শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, নিজের স্বার্থে ক্ষমতাবানরা অন্যের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। নিজের কাজে সারাদেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে নারী নির্যাতন বেড়ে গেছে। এই নির্যাতন বন্ধ করতে কমিশনকে কাজ করতে হবে। কমিশনকে তিনি প্রতিটি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করতে ও মানবাধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজ হাতে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ৯৫ বার পেছানো হয়েছে। এত বিলম্বের জন্য তদন্তকারী সংস্থার কাছে ব্যাখ্যা জানা প্রয়োজন। এ ছাড়া কোনো সাংবাদিকও এর কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে পারেনি, যা দুর্ভাগ্যজনক। কমিশন সব চাপের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আলোচনাকালে সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক এক শীর্ষ নেতা মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, কমিশনের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের দেখার চোখের বাইরে অন্যভাবে দেখে কাজ করা। কমিশনের কোনো ক্যাম্পেইন নেই। মানুষের আস্থা অর্জন ও চোখে পড়ার মতো কাজ করতে পারছে না। মানবাধিকার কমিশন সাংবাদিক হত্যার বিচার নিয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারে বলে দাবি করেন তিনি।

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সংবাদমাধ্যমও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়। বাঁচার অধিকারই প্রথম মানবাধিকার। হিংস্র কায়েমি স্বার্থের হাতে সাংবাদিকরা নিহত হন। বিচার হয় না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এক ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি বলেন, যে সময়কালের পর্যবেক্ষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তখন দেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ছিল। কিছু বলেনি। তিনি অঘোষিত গ্রেপ্তার, বন্দুকযুদ্ধ, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনাবলির বিষয়ে নজর দিতে কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ইউএনবির সম্পাদক ফরিদ হোসেন, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান, একুশে টিভির সিইও পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, এবি নিউজের প্রধান সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র সিংহ রায়, এটিএন বাংলার জ ই মামুন, রাইজিং বিডিডটকমের প্রধান সম্পাদক এসএম জাহিদ হাসান প্রমুখ।

আরও উপস্থিত ছিলেন ডেইলি অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, ইনডিপেনডেন্ট টিভির ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশীষ সৈকত, ইত্তেফাকের কূটনৈতিক সম্পাদক মাঈনুল আলম প্রমুখ।