শ্রমে নিযুক্ত সব শিশু কোনো না কোনোভাবে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। গত বছর শিশু নির্যাতন ২০২১ সালের তুলনায় বেড়েছে। শিশু হত্যার ঘটনাও গত বছর বেড়েছে। এসব তথ্য প্রকাশ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এ সময় গৃহশ্রমকে শিশুশ্রমের তালিকাভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, গৃহশ্রমে নিযুক্ত বেশিরভাগই শিশু এবং তারা অধিক হারে নির্যাতনের শিকার।

সমকালসহ আটটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত শিশু অধিকার বিষয়ক সংবাদ পর্যালোচনা করে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে। 'বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি ২০২২ :সংবাদপত্রের পাতা থেকে' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে ৩১১ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে এবং অন্য ৪২ শিশুকে হত্যা করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। ২০২১ সালে হত্যার শিকার হয়েছিল ১৮৩ শিশু। গত বছর ৬৮ শিশু ভয়াবহ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০২১ সালে ভয়াবহ নির্যাতনের ১৬টি ঘটনা ঘটেছে। নির্যাতনকারীদের মধ্যে আছেন গৃহকর্তা, বাবা-মা, শিক্ষক, উত্ত্যক্তকারী, স্থা নীয় চেয়ারম্যান, চাকরিদাতা, প্রতিবেশী এবং সৎমা।

সংবাদ সম্মেলনে শিশু পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করেন এমজেএফের কো-অর্ডিনেটর রাফেজা শাহীন। তিনি জানান, বাল্যবিয়ের হার ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ৯৪ শতাংশ কমেছে। ২০২১ সালে দেশের ২৩টি জেলায় ৪১ হাজার ৯৫টি বাল্যবিয়ের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালে বাল্যবিয়ের সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ২ হাজার ৩০১টি। করোনার সময় অর্থাৎ ২০২০-২১ সালে স্কুল বন্ধ থাকায় ও বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পেলেও ২০২২ সালে তা কমেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১-এর তুলনায় ২০২২ সালে শিশু ধর্ষণের হার কমেছে ৩১.৫ শতাংশ। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৬০ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৯৮ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে ১২ শিশু। ২০২১ সালে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৮১৮।
খবর বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশু ধর্ষণ পারিবারিক পরিবেশে পরিচিতদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। একইভাবে পারিবারিক কারণেই বাল্যবিয়ে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবারের পরিচিত লোকদের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার হওয়া ছাড়াও প্রতিবেশীদের হাতে শিশুদের একটি বড় অংশ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তিন-চার বছর থেকে ১২ বছর পর্যন্ত শিশুরা অধিক হারে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বেশির ভাগ শিশুকে খেলার সময় লোভ দেখিয়ে পরিচিতরা ধর্ষণ করেছে। মূলত কম বয়সী শিশুরাই ধর্ষণের শিকার বেশি হচ্ছে। কিশোরীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বন্ধুদের দ্বারা, কর্মক্ষেত্রে, স্কুলে যাওয়ার পথে ও পরিবারের ভেতরে।

২০২২ সালে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালে পানিতে ডুবে ৪০৫ শিশু মারা গিয়েছিল, ২০২২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১ হাজার ১৫২। এর মধ্যে ৫২০ মেয়ে শিশু ও ৬৩২ ছেলে শিশু।

যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুর সংখ্যা ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে কমলেও, ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার হার বেড়েছে। ২০২২ সালে মোট ৯৬ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ছেলে শিশু ২০। ২০২১ সালে ছিল ৬ জন। বিভিন্ন কারণে গত বছর আত্মহত্যা করেছে ৪৪ শিশু। এদের মধ্যে ২৭ মেয়ে ও ১৩ ছেলে। ২০২১ সালে আত্মহত্যা করা শিশুর সংখ্যা ছিল ৭৮। এদের মধ্যে ছেলে শিশু ৫৭ ও মেয়ে শিশু ২১। মূলত পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়, পরিবারের ওপর রাগ, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে, উত্ত্যক্ত হওয়ায়, ধর্ষণের শিকার হওয়ায় বা ধর্ষণচেষ্টা করায়, ধর্ষণের বা শ্নীলতাহানির বিচার না পাওয়ায় এবং সাইবার ক্রাইম বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

এমজেএফ ২০১১ সাল থেকে সংবাদপত্রকে উৎস হিসেবে ধরে শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের সংবাদ নিয়মিত সংরক্ষণ করতে শুরু করে। সমকাল ছাড়া অন্য পত্রিকাগুলো হলো- প্রথম আলো, যুগান্তর, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, ডেইলি স্টার, নিউএজ ও ঢাকা ট্রিবিউন। সংবাদ সম্মেলনে এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, তাঁদের বিশ্নেষণ অনুযায়ী শিশুরা নিজের বাসায়ও নিরাপদ নয়। শিশু ধর্ষণ ও শিশুকে যৌন হয়রানি বন্ধ করার জন্য সবাইকে এখনই জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে, নতুবা এই হার বাড়তেই থাকবে। তিনি শিশু সুরক্ষায় নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের সবাইকে আরও বেশি সহৃদয়বান হওয়ার পাশাপাশি শিশু অধিকার রক্ষায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন- সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আমরান খান, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা ও এমজেএফের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর শাহানা হুদা রঞ্জনা।