দেশে সড়কে প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। দুর্ঘটনায় বছরে কত মানুষ মারা যাচ্ছেন- সে তথ্য নিয়ে রয়েছে বিভ্রান্তি। একেক সংস্থা দিচ্ছে একেক রকম তথ্য। আর এ অমিল নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা লেগে আছে দ্বন্দ্ব। সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান বলছে, দুর্ঘটনার সংখ্যা কমলেও বেসরকারি সংগঠনগুলো মনগড়া তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরছে। আর বেসকারি সংস্থা বলছে, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান সারা দেশে দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করে না। তারা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্যের উপর নির্ভর। যেসব দুর্ঘটনার মামলা হয়, পুলিশের হিসাবে শুধু সেগুলোই আসে। কিন্তু সব দুর্ঘটনা বা এসব দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের ক্ষেত্রে মামলা হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা বের করা না গেলে সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। দুর্ঘটনা নিয়ে সমন্বিত, বহুমাত্রিক, গ্রহণযোগ্য তথ্যব্যাংক থাকা দরকার। এটি তৈরি করতে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আর বৈশ্বিকভাবেও এর গুরুত্ব আছে। কারণ, সড়ক ব্যবস্থার নিরাপত্তা উন্নয়নের সূচক। অতীতের তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে বর্তমানের তথ্য মিলিয়ে ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেত হবে।

তিন সংগঠনের তথ্যে ফারাক

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ও যাত্রী কল্যাণ সমিতি সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং মৃত্যুর তথ্য দেয়। তাদের দেওয়া মৃত্যুর হিসাবে ফারাক এক হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার পর্যন্ত।

গত ২ জানুয়ারি প্রকাশিত যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২২ সালে দেশে ছয় হাজার ৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৯৫১ জনের প্রাণ ঝরেছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১২ হাজার ৩৫৬ জন। সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির এ সংখ্যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

অন্যদিকে গত ৭ জানুয়ারি প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দেশে ছয় হাজার ৮২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৭১৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬১৫ জন। 

৪ জানুয়ারি প্রকাশিত নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ২০২২ সারাদেশে পাঁচ হাজার ৭০টি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ৭৬০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাত হাজার ৩৩১ জন।

তিনটি সংগঠনেরই তথ্যের উৎস পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম। ২০১২ সাল থেকে নিয়মিত দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করছে নিসচা। সংগঠনটি জানিয়েছে, এই পরিসংখ্যান ও প্রতিবেদনের কাজটি করা হয়েছে পুরোপুরি সেকেন্ডারি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। এতে ১১টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার তথ্য, অনলাইন পোর্টাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তথ্য এবং নিসচার শাখা সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন যুক্ত হয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সাতটি জাতীয় দৈনিক, পাঁচটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। আর যাত্রী কল্যাণ সমিতি ৬০টি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকা এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে ভিন্নতার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো পত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। কেউ হয়তো চারটি পত্রিকার সংখ্যা নেয়, কেউ আটটি। এ জন্যই তাদের সংখ্যায় এত তারতম্য হয়। একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উন্নত পদ্ধতি মেনে দুর্ঘটনার সংখ্যা নিরূপণ করা উচিত। প্রকৃত সংখ্যা বের করা না গেলে দুর্ঘটনা বন্ধে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা যাবে না। ট্রাফিক পুলিশ ডাটা সংগ্রহ করে। তারা যদি প্রতিদিন বা প্রতিমাসের তথ্য এন্ট্রি করে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানায়, তাহলে ভালো হয়। সেখান থেকে যার যেটা দরকার নিয়ে নিল।’

এ বিষয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘একেকজন একেক মেথড নিয়ে প্রতিবেদন করে। এই কারণে পার্থক্যটা হয়। এই অবস্থা নিরসনে জাতীয়ভিত্তিক তথ্য ব্যাংক বানাতে হবে। সরকারকে নিতে হবে এই উদ্যোগ। আমাদের মতো নাগরিক সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এই তথ্য ব্যাংক করতে পারে।’

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেদন যে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করেছে সেটাও দাবি করছি না। কারণ প্রকৃত চিত্র আরও অনেক বেশি। অনেক দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে না।’

সরকারি হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমেছে

বেসরকারি সংগঠনগুলোর হিসাবে ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যু বাড়লেও সরকারি হিসাবে কমেছে। পুলিশের বরাতে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গত ১৫ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছে, ২০২২ সালে পাঁচ হাজার ২০০ দুর্ঘটনায় চার হাজার ৬৩৮ জন নিহত হয়েছেন। আগের বছরে পাঁচ হাজার ৪৭২ দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে পাঁচ হাজার ৮৪ জনের। ২০২১ সালের চেয়ে সড়কে মৃত্যু প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে।

আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, চালকের অদক্ষতা, গাড়ি ও সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে- বেসরকারি সংগঠনগুলো এ অভিযোগ করলেও সড়ক পরিবহন সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী তা নাকচ করেন। তিনি বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিটি মৃত্যুর হিসাব পুলিশ রাখে। দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে লাশ দাফন করতে পুলিশের সংশ্নিষ্টতা রয়েছে। ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফন করতে হলে জেলা প্রশাসকের অনুমতি লাগে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বাংলাদেশে বছরে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় সড়কে। এ তথ্য বাংলাদেশি সংগঠনগুলোর দেওয়া বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এসব ভুল তথ্যে দেশের নাম খারাপ হয়।’ তিনি অভিযোগ করেন, বেসরকারি সংগঠনগুলো সংবাদপত্রের খবরের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে একই দুর্ঘটনা একাধিকবার লিপিবদ্ধ হয়।’

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যু অর্ধেক কমিয়ে আনতে হবে। সচিব বলেন, ‘এ লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে। ২০১০ সালে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের বিপরীতে ১৯ দশমিক ৮১টি দুর্ঘটনায় ১৮ দশমিক ৫৪ জনের প্রাণ গেছে। ২০২২ সালে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের বিপরীতে ৯ দশমিক ৩টি দুর্ঘটনায় ৮ দশমিক ২৯ জন নিহত হয়েছেন। প্রতিবেশী ভারত ও নেপালের চেয়ে বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো।

নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘বারবার বলার পরও ডাটা সেন্টার তৈরি না হওয়ায় দুর্ঘটনার নির্ভুল পরিসংখ্যান কেউ দিতে পারছে না। সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বের করা একটি দুরূহ কাজ। কাজটি করা হয় বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্নভাবে তথ্য প্রকাশ করছে বলে বিভ্রান্তি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সরকারের কোনো পরিসংখ্যান নেই। কাজটি যদি সরকার করত, তাহলে পরিসংখ্যানের এই পার্থক্য হতো না।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের রোড সেফটি উইংয়ের পরিচালক শেখ মো. মাহবুব-ই-রাব্বানি বলেন, ‘আমাদের কাছে সড়ক দুর্ঘটনার কোনো পরিসংখ্যান নেই। আমাদের সংস্থা এ বিষয়ে কাজ করে না। যখন প্রয়োজন হয় তখন আমরা পুলিশের কাছ থেকে সংগ্রহ করি।’

সরকারি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করছে না

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ এবং তার পরিসংখ্যান তৈরি করে প্রকাশের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিআরটিএ এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের রোড সেফটি নামের আলাদা উইং রয়েছে। অথচ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই তিন সংস্থার কেউ সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক তথ্য সংরক্ষণ করছে না। যখন কেউ এই তথ্য চাইছেন, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর দেওয়া অসত্য তথ্য প্রতিনিয়ত বলা হচ্ছে।’

ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘এসব সংস্থা আসলে কারও কাছে দায়বদ্ধ বলে মনে হচ্ছে না। কারণ যার যে দায়িত্ব সে তো সেটা পালন করছে না। বাংলাদেশ সরকারকে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকেরও নিচে নামিয়ে আনতে হবে। বিষয়টি মাথায় রেখে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো তাদের ইচ্ছামাফিক মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি করছে। অথচ প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। সড়ক দুর্ঘটনাকে সরকার যদি জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখত তাহলে অবশ্যই এ বিষয়ে তারা কাজ করত।’

শামসুল হক বলেন, ‘কোভিডকে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা কখন মহামারি ঘোষণা করেছে? যখন তাদের কাছে আক্রান্তের সংখ্যা, আক্রান্তের ধরন ও স্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছিল। যখন সঠিক পরিসংখ্যান থাকে তখন যেকোনো সমস্যা সমাধানের সঠিক উপায় ও পন্থা অনুসরণ করা সম্ভব। যেহেতু সড়ক দুর্ঘটনাকে সরকার জাতীয় সমস্যা হিসেবে মনেই করছে না, সেহেতু তারা এটির সঠিক পরিসংখ্যান রাখা এবং সেটি প্রকাশ করাকে দায়িত্ব মনে করছে না।’

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘সরকার বা বেসরকারি সংগঠন, যে-ই হোক, সবারই এ দায়িত্ব আছে। তবে সঠিক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার মূল দায়িত্ব সরকারের। সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ নানা প্রতিষ্ঠান আছে। দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্তের জন্য খুব বেশি হলে সরকারের আর বাড়তি ৩০০ কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। তাদের সুনির্দিষ্টভাবে এ কাজে লাগাতে হবে। বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই এটা সম্ভব।