বাংলাদেশকে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে কৌশল বা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে (আইপিএস) চায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। তবে একে বিরুদ্ধ প্রক্রিয়া মনে করে চীন। ফলে বেইজিং চায় না বাংলাদেশ এমন কোনো প্রক্রিয়ায় যোগ দিক, যা তাদের বিরোধী। দু'পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় আইপিএস নিয়ে বাংলাদেশ তার নিজের অবস্থান তৈরি করছে। মার্চের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করা হবে।

ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন সমকালকে বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশের কী চাওয়া রয়েছে এবং আমাদের যে অগ্রাধিকারগুলো রয়েছে, তা আমরা প্রস্তুত করছি। কানাডা আইপিএস নিয়ে তাদের অবস্থান প্রকাশ করেছে, যা বাংলাদেশের সঙ্গে মিলে যায়। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি। মার্চের মধ্যে আমাদের অবস্থান বিস্তারিত তুলে ধরব।

বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও প্রবৃদ্ধিতে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এ নিয়ে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা জোট ও চীনের একটি প্রতিযোগিতা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপানসহ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে তাদের অবস্থান পরিস্কার করেছে। বাংলাদেশও তার পূর্ণাঙ্গ অবস্থান পরিস্কার করতে যাচ্ছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর ইতালি সফরে বাংলাদেশ সংক্ষিপ্ত অবস্থান তুলে ধরেছিল।

আইপিএসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি মাথায় রেখে বিস্তারিত কৌশল প্রস্তুত করছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে ছয়টি বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছে ঢাকা। এ অঞ্চলে দেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে সাহায্য-সহযোগিতা জোরদার করা। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য গবেষণা, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির বিনিময় সহযোগিতা। বঙ্গোপসাগর ঘিরে দেশগুলো মধ্যে যেহেতু সমন্বয় সবচেয়ে কম, সেহেতু এখানে কানেক্টিভির উন্নয়ন চায় বাংলাদেশ, যা উন্নয়নের মূলে রয়েছে। কারণ শান্তি ও স্থিতিশীলতায়ও তা অবদান রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় অঞ্চলের দেশগুলোর অভিন্ন পদক্ষেপ চায় ঢাকা। সমুদ্র সম্পদের অনুসন্ধান, উন্নয়নে সহযোগিতা ও জ্বালানি হাব তৈরির মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশের অবস্থানপত্রে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

আইপিএসে নিয়ম মেনে বাণিজ্যেও জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ, যাতে করে এ অঞ্চল নিয়ে যে প্রতিযোগিতা রয়েছে, তা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করা যায়। যে কোনো মতানৈক্য জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইন মেনে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব বলে বাংলাদেশ মনে করে।

নাম না প্রকাশের শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আইপিএসকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতার সঙ্গে অর্থনৈতিক দিক থেকে সক্ষমতারও বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে এখনও কোনো দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়নি। ফলে এ ধরনের কোনো উদ্যোগের সঙ্গে থাকতে খুবই ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নিতে হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাউন্সিলর ডেরেক এইচ শোলের সফরে আইপিএস নিয়ে আলোচনা করা হবে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল এইলিন লাউবেখারের সফরেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। লাউবেখার বলেছিলেন, এটি এমন কোনো বিষয় নয়, বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে বা আমন্ত্রণ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছে। ওয়াশিংটন চায় বাংলাদেশও এ নিয়ে তাদের অবস্থান পরিস্কার করুক।

জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরের সময়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে এইলিন লাউবেখার সমকালকে বলেছিলেন, আইপিএস কোনো সামরিক জোট নয় কিংবা এর মাধ্যমে কোনো সামরিক জোট গড়ে উঠুক, তেমন কোনো চাওয়া এখানে নেই। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি হলো একটি ইতিবাচক যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি। যার লক্ষ্য হলো এমন একটি অঞ্চল গড়ে তোলা, যেখানে সব দেশ বাংলাদেশ, চীন, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও যেসব দেশ এই অঞ্চলে আছে, তারা সবাই যেন উন্নতি করতে পারে।

আইপিএসে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছে। যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প নেওয়ার পরপরই আইপিএস নিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। দুটি উদ্যোগের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে বাংলাদেশ। তবে গত বছরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আইপিএস নিয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক করে দেন ঢাকায় চীনের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সামরিক জোটে যোগ দিলে তা বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।