দেশে নারী নির্যাতনের হার বাড়ছেই। ২০২২ সালে ৯ হাজার ৭৬৪ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪ হাজার ৩৬০ জন। ধর্ষণের পর হত্যার করা হয়েছে ৪৫০ জনকে। আর এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ২৭টি। 

গণমাধ্যম এবং পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে নারীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) লাইট হাউজ। সোমবার বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘মিডিয়া অ্যাডভোকেসি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী প্রধান মো. হারুন অর রশিদ। 

গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে সংস্থাটি। ইউএসএআইডির আর্থিক সহায়তায় এবং পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনালের কারিগরি সহাযোগিতায় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে লাইট হাউজ।

লিখিত বক্তব্যে হারুন অর রশিদ বলেন, সহিংসতার শিকার এসব নারীদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪ হাজার ৩৬০ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৫০ জনকে। আর দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৪০ জন। যৌতুকের কারণে মারধর করা হয়েছে ২ হাজার ৬৭৫ জনকে এবং যৌতুক না পেয়ে হত্যা করা হয়েছে ১৫৫ জনকে।এছাড়া অপহরণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৭০ জনকে। এসব বিষয়ে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১৭ হাজার ২৭টি মামলা হয়েছে। 

তিনি বলেন, সাধারণত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা গুরুতর হলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ৯টি পত্রিকা এবং কিছু অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরের তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে গত ১১ মাসে (২০২২ সালে) নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ১৮৪টি খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ ধর্ষণের খবর। প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা আরও বেশি হবে। 

অনলাইনে নারী ও শিশু নির্যাতন ব্যাপক হারে বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ) অনুসারে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভুয়া আইডি, আইডি হ্যাক, ব্ল্যাকমেইলিং, মোবাইল ফোনে হয়রানি, আপত্তিকর কনটেন্ট বা বিষয় ছড়ানোর অভিযোগ করেছেন ৮ হাজার ৭১৫ জন নারী।

বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে লাইট হাউজের নির্বাহী প্রধান বলেন, গত পাঁচ বছর আগের তুলনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মাসে গড়ে ৩৫০টি মামলা বেড়েছে। বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, প্রতারণা, যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে অনলাইন প্লাটফর্ম। গত বছরের শুরুর দিকের তুলনায় শেষের দিকে অনলাইনে নির্যাতনের অভিযোগ বেড়েছে ২৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দেশের ৫৪ শতাংশ নারী জীবনে একবার হলেও শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী এ সহিংসতা শুধু নারী ও কন্যার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে না, সামগ্রিকভাবে দেশ-সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সমাজে নারীদের প্রতিনিয়ত শারীরিক মানসিকভাবে অপদস্ত হতে হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আয়শা সিদ্দিকী বলেন, নারীদের উন্নয়নে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ফলে নারীরা এখন আগের তুলনায় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। আগামীতে নারী সমাজ আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন নারী পক্ষের পরিচালক অ্যাডভোকেট কামরুন্নাহার, পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি সাহরাব হুসেন ও আজকালের সম্পাদক ফারুক আহম্মেদ তালুকদার প্রমুখ।