মাদারীপুরের শিবচরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া ইমাদ পরিবহনের বাসটির নিহত চালক মো. জাহিদ ক্লান্ত ছিলেন না। ১৯ জনের প্রাণঘাতী এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গতি, চালকের দক্ষতায় ঘাটতি এবং মাত্র চার মাস পৃথক দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসটি এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলের উপযোগী ছিল না।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনে এ তথ্য এসেছে। এতে বলা হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন অংশে গার্ড রেইল বা রেলিং থাকলেও দুর্ঘটনাস্থলে তা ছিল না। তাই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিনা বাধায় ২৪ ফুট নিচে পড়ে যায়। এতে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়েছে। বাসের ভেতরে যাত্রীদের পা রাখার (লেগ রুম) পর্যাপ্ত জায়গা এবং বিভিন্ন অংশ সফট ম্যাটেরিয়ালে ঢাকা ছিল না। তাই যাত্রীরা প্রাণে রক্ষা পাননি।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গত রোববারই মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পল্লব কুমার হাজরাকে সভাপতি করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির বাকি তিন সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ফকি, বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ হাসানাত-ই-রাব্বি, বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হোসেন। গতকাল বুধবার মাদারীপুরের জেলা প্রশাসককে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি। এতে দুর্ঘটনার তিন কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে ১৪টি সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে, ইমাদ পরিবহনের বাসটি ১৭ নভেম্বর গোপালগঞ্জের গোপীনাথপুরে থেমে থাকা ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল। এতে পুলিশ সদস্যসহ তিনজন নিহত হন। সেই মামলায় বাসটি জব্দ হয়। বাসটির নিবন্ধন স্থগিত করেছিল সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গত ৪ ডিসেম্বর আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর বাসটি মেরামত করে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে সায়েদাবাদ-খুলনা রুটে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছিল। গত ১৯ জানুয়ারি বাস ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়। বাসটির নিবন্ধন স্থগিত থাকলেও এ তথ্য সমন্বিত ডাটাবেজে ছিল না।
তাই পথে চলতে ধরা পড়েনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিবন্ধন স্থগিত এবং ফিটনেস মেয়াদ উত্তীর্ণ বাস এক্সপ্রেসওয়েতে চালানো আইনের লঙ্ঘন। চালক মো. জাহিদের ভারী যান চালানোর অনুমতি ছিল না। তিনি মধ্যম শ্রেণির গাড়ি চালানোর লাইসেন্সধারী চালক ছিলেন, যা আইনের লঙ্ঘন। নিবন্ধন স্থগিত থাকা বাস মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্সধারী চালক দিয়ে কেন চালানো হয়েছে, এর জবাব দিতে পারেনি ইমাদ পরিবহন কর্তৃপক্ষ।

দুর্ঘটনার পর অভিযোগ ওঠে, চালক আগের ৪৮ ঘণ্টার ৩০ ঘণ্টাই বাস চালিয়েছেন। তবে চালকের স্ত্রী সীমা তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী ঢাকা থেকে যাত্রা করে গত শনিবার রাত ৮টায় খুলনায় পৌঁছান। সেখানে রাতে বিশ্রাম নিয়ে রোববার ভোরে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। খুলনায় যাত্রা করার আগে প্রায় এক সপ্তাহ তিনি পরিবারের সঙ্গে ছিলেন। চালক শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমাদ পরিবহনের জিপিএস ট্র্যাকার অনুযায়ী বাসটি যাত্রা করার পর দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল। বাসে আসনের চেয়ে বেশি যাত্রী ছিল। সুপারভাইজারের লাইসেন্স ছিল না। ইমাদ পরিবহন দাবি করেছে, চাকা ফেটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তদন্তকারীরা বাসের বাম চাকার টায়ার ও টিউব ক্ষতিগ্রস্ত পেয়েছেন। তবে তা দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা নিশ্চিত হতে পারেনি কমিটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ের শুরুর এক কিলোমিটার সরলরৈখিক। তাতে র‍্যাম্বল স্ট্রিপ নেই। সে কারণে চালকরা গতি বাড়িয়ে দেন। মহাসড়কে নষ্ট হওয়া সময় পুষিয়ে নিতে এক্সপ্রেসওয়েতে গতি বাড়িয়ে দেন চালকরা। আহত যাত্রী সাইফুল ইসলাম তদন্ত কমিটিকে বলেছেন, এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার পর চালক অস্বাভাবিকগতিতে বাস চালান। চালক ও সুপারভাইজারের মধ্যে বাসের ব্রেকের জটিলতা নিয়ে কথোপকথন শোনেন। চাকা ফেটে যাওয়ার শব্দ শোনেননি।
এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রীদের সিটবেল্ট রাখা, বাসের ভেতরের অংশ সফট বস্তুতে ঢেকে রাখা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, জিপিএসের মাধ্যমে নজরদারি, সমন্বিত ডাটাবেইজ তৈরিসহ ১৪টি সুপারিশ করা করা হয়েছে।




বিষয় : এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনা

মন্তব্য করুন