বৈশ্বিক মন্দাভাব ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রেতাদের আমদানি কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে দেশের পোশাক রপ্তানি কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এ জন্য আগামী পাঁচ বছর রপ্তানিতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে রাখাসহ বেশ কিছু দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান। এ সময় বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি, সহসভাপতি শহীদউল্লাহ আজিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান। তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরেই বিজিএমইএ বলে আসছে পোশাক রপ্তানিতে একটি মন্দাভাব শুরু হতে যাচ্ছে। গত ছয় মাসে রপ্তানিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও মূলত উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে। সেই চিত্র রপ্তানি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ এবং এপ্রিলে পোশাক রপ্তানি মূল্যের দিক থেকেও নেতিবাচক। এ ক্ষেত্রে রপ্তানি মার্চে ১ শতাংশ এবং এপ্রিলে ১৫ শতাংশ কমেছে।

 প্রধান বাজারগুলোতে পোশাক রপ্তানি কমছে বলে উল্লেখ করেন বিজিএমইএর সভাপতি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইট ওটেক্সার তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, গত বছরের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির পরিমাণ কমছে। আমদানির পরিমাণ কমেছে নভেম্বরে প্রায় ১০ শতাংশ ও ডিসেম্বরে প্রায় ১৩ শতাংশ। জানুয়ারিতে কিছুটা বাড়লেও ফেব্রুয়ারি এবং মার্চে আবার নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়। সব মিলিয়ে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে ১২ শতাংশের মতো। অন্যদিকে পরিমাণে তা প্রায় ২৫ শতাংশ।

তিনি বলেন, ইউরোপভিত্তিক ওয়েবসাইট ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি– এ চার মাসে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের পোশাক আমদানি মূল্য বেড়েছে সাত শতাংশ। আর পরিমাণে কমেছে চার শতাংশ। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্যোক্তারা উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য রপ্তানি করছেন। এ কারণে মূল্যের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ইপিবির তথ্য অনুসারে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকার পরও ইউরোপ-আমেরিকায় বাংলাদেশ থেকে আমদানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে রপ্তানিতে যে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার প্রতিফলন ইউরোপ-আমেরিকার এপ্রিল-মে মাসের আমদানি তথ্যে দেখা যাবে। এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য সত্যিই শঙ্কাজনক হবে।

বিজিএমই সভাপতি জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতা ফোরামের সঙ্গে গত বুধবার বিজিএমইএ বৈঠক করেছে। কিন্তু ক্রেতারা তাদের ভবিষ্যৎ আমদানি সম্পর্কে আশাব্যঞ্জক কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তবে নতুন বাজারগুলোতে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে আউটার ওয়্যার ও একটিভ ওয়্যারে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এসব নন-কটন পণ্যের কাঁচামাল উৎপাদনে বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে আছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নতুন বাজারের জন্য প্রণোদনা সুবিধা অব্যাহত রাখা দরকার। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটময় মুহূর্তে রপ্তানি আয় স্থিতিশীল রাখা ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার কোনো বিকল্প নেই।

ফারুক হাসান বলেন, পোশাক শিল্পের বহুমুখীকরণের অনেক সুযোগ আছে। বিশ্ব পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এটি ১২ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি ২০৩০ সাল নাগাদ ১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিজিএমইএ।

তিনি বলেন, পোশাক খাতের সুরক্ষা ও রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। তাই আগামী পাঁচ বছরের জন্য রপ্তানির বিপরীতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে এ খাতের করপোরেট কর ১২ শতাংশ হারে ধার্য করতে হবে। এ ছাড়া পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে উৎসাহিত করতে নন-কটন পোশাক রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ (রপ্তানি মূল্যের) হারে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া দরকার। বন্ড লাইসেন্স দুই বছরের পরিবর্তে তিন বছর করার পক্ষে মত দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এসব বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।