ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

উপকলেজ পরিদর্শকের পদে পদে দুর্নীতি

উপকলেজ পরিদর্শকের পদে পদে দুর্নীতি

কোলাজ

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪ | ০৫:৫৫

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপকলেজ পরিদর্শক পদে সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়াই ২০২১ সালে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান ডা. জোহা মোহাম্মদ মেহেরওয়ার হোসেন। তথ্য গোপন করে সে সময় একসঙ্গে দুই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন তিনি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তিন বছরে ছয়বার চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ বাড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ডা. জোহার বিরুদ্ধে অনিময় ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠেছে। ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো এবং অনিয়মের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া একাধিক নার্সিং কলেজ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে চালু করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে উপাচার্যের সঙ্গে সখ্য থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না।

সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (রামেবি) কলেজ পরিদর্শক পদে চুক্তিভিত্তিক নিযুক্ত ছিলেন অধ্যাপক ডা. মোসাদ্দেক হোসেন। ২০২৩ সালে তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হয়। সে বছর অক্টোবরে ১৪তম সিন্ডিকেট সভায় স্থায়ী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত মোসাদ্দেক হোসেনের নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। তবে তাঁর মেয়াদ না বাড়িয়ে কলেজ পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপকলেজ পরিদর্শক ডা. জোহাকে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ থাকলেও ডা. জোহাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ইউজিসির বিধান অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের অনুমোদনক্রমে শুধু অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম বা জনবল কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত শূন্য পদে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া যাবে। এ ছাড়া এসব পদে নিয়োগের আগে জাতীয় গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। তবে ডা. জোহার নিয়োগে এমন বিধান অনুসরণ করা হয়নি। 

এ ব্যাপারে সাবেক কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় আমি চাকরি থেকে অবসরে গিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখভালের দায়িত্ব কলেজ পরিদর্শক কমিটির। 

এসব প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা দেখার দায়িত্ব থাকে কলেজ পরিদর্শকের। তাই  এই পদে অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, কলেজ পরিদর্শন কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডিন বা একজন অধ্যাপক রাখতে হবে। পরিদর্শন কমিটি তিন থেকে পাঁচ সদস্যের হবে। এই কমিটিতে অধ্যাপকের নিচে কাউকে রাখা যাবে না। তবে উপকলেজ পরিদর্শক  ডা. জোহা নিজের পছন্দ মতো পরিদর্শন কমিটি গঠন করেন, যা অধিভুক্ত কলেজ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নীতিমালাবহির্ভূত।

ডা. জোহা যশোর মেডিকেল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় পিআরএলে যান। পিআরএলে থাকা অবস্থায় ২০২১ সালের আগস্টে তিনি রামেবিতে উপকলেজ পরিদর্শক পদে ছয় মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। এ সময় দুই প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন-ভাতা তুলে সাড়ে ৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে। রামেবি কর্তৃপক্ষ প্রায় চার মাস পর বিষয়টি জানতে পেরে তাঁকে আত্মসাৎ করা অর্থ ফেরত দিতে বলে। কিন্তু ডা. জোহা পুরো অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ না করে প্রতি মাসে কিস্তিতে পরিশোধসহ চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ চান। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও রামেবি উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম মোস্তাক হোসেন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি ডা. জোহার বিরুদ্ধে। 

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালা অনুযায়ী কলেজ পরিদর্শন শেষে অধিভুক্তি বিষয়ক কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। তবে কমিটিকে বাদ দিয়ে ডা. জোহা নিজে উপাচার্যের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন। তাঁর এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে অধিভুক্তি বিষয়ক কমিটির একাধিক সদস্য ও বেসরকারি নার্সিং কলেজের এক অধ্যক্ষ উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগের অনুলিপি সমকালের হাতে এসেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

রামেবির রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাকির হোসেন খোন্দকার কলেজ পরিদর্শন কমিটির সদস্য। তিনি বলেন, কলেজ পরিদর্শন শেষে কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। তবে এখন পর্যন্ত কলেজ পরিদর্শনের একটি প্রতিবেদনও কমিটির কাছে জমা দেননি উপকলেজ পরিদর্শক।

জানা গেছে. ডা. জোহা বিধির তোয়াক্কা না করে ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে রামেবির সব পরিদর্শন কমিটির সদস্য সচিব হয়েছেন এবং আর্থিকসহ সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। এ ছাড়া রামেবির কর্মকর্তা হয়েও তিনি আগের সহযোগী অধ্যাপক পরিচয়ে এখনও বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার পরীক্ষক হয়ে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আর্থিক সুবিধা নিয়ে বন্ধ থাকা একাধিক নার্সিং কলেজ চালু করে দেওয়ার অভিযোগ আছে ডা. জোহার বিরুদ্ধে। টাকা না দিলে  সব কিছু ঠিক থাকা প্রতিষ্ঠানও নবায়ন পায় না। টাকা দিলে অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানও নবায়ন পেয়ে যায়। 

অনিয়মে বন্ধ প্রতিষ্ঠান তদবিরে চালু

অনিয়মের কারণে রাজশাহীর মির্জা নার্সিং কলেজের অধিভুক্তি ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও নার্সিং কাউন্সিলের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন। তবে ডা. জোহা আর্থিক সুবিধা নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বেসরকারি নার্সিং কলেজ পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর এই নিবন্ধন নবায়ন করতে হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২তম সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নবায়ন ছাড়া নার্সিং কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করলে ৫ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে। তবে ডা. জোহা নগর নার্সিং কলেজ, হেলথ কেয়ার নার্সিং কলেজ, প্রিমিয়ার নার্সিং কলেজ, পাবনা ইন্টারন্যাশনাল নার্সিং কলেজ, গ্লোবাল নার্সিং কলেজ অনিয়ম করলেও আর্থিক সুবিধা নিয়ে জরিমানা ছাড়া নিবন্ধন নবায়ন করেছেন। এতে রাজস্ব হারিয়েছে সরকার।

রামেবির নীতিমালা অমান্য করা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক, যন্ত্রপাতি ও উপযুক্ত অবকাঠামো না থাকার পরেও আসন সংখ্যা বৃদ্ধির অনুমতি দিয়েছেন ডা. জোহা। নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল ও নার্সিং কলেজে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক, যন্ত্রপাতি ও উপযুক্ত অবকাঠামো না থাকার পরও আসন সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এসব নার্সিং কলেজ ফের পরিদর্শনের দাবি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে ‘অধিভুক্তি বিষয়ক কমিটি’।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়া ডা. জোহার নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোস্তাক হোসেন বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন,  দক্ষ জনবল না পাওয়ায় ডা. জোহার চাকরির মেয়াদ ছয়বার বাড়ানো হয়েছে। তবে দক্ষ লোক নিয়োগে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। উপাচার্য বলেন, ডা. জোহার বিরুদ্ধে নার্সিং কলেজ পরিদর্শন সংশ্লিষ্ট অনিয়ম নিয়ে একটি চিঠি পেয়েছি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। সবশেষে তিনি সংবাদ প্রকাশ না  করার অনুরোধ জানান।

এ ব্যাপারে ডা. জোহা মোহাম্মদ মেহেরওয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, তাঁর নিয়োগ অবৈধ– এ অভিযোগ সঠিক নয়। ছয়বার নিয়োগের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পাববে। বন্ধ মির্জা নার্সিং কলেজ মানবিক বিবেচনায় ও বিভিন্ন ব্যক্তির সুপারিশে চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া নবায়ন না নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অধ্যাপক না হলেও তাঁকে কলেজ পরিদর্শনের সুযোগ দিয়েছেন উপাচার্য।

আরও পড়ুন

×