ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

রাজনীতির 'দোকানদারি' বন্ধ করতেই হবে

সুনির্দিষ্ট তিনটি বিষয় কার্যকরের প্রস্তাব

সুনির্দিষ্ট তিনটি বিষয় কার্যকরের প্রস্তাব

আমির হোসেন আমু

শাহেদ চৌধুরী

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২১ | ১৪:২৮

রাজনীতিতে গজিয়ে ওঠা ভুঁইফোঁড় সংগঠন নিয়ে চলছে নতুন করে আলোচনা। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করেই গড়ে উঠেছে প্রায় ১০০ সংগঠন। যারা নামের আগে-পরে 'বঙ্গবন্ধু', 'আওয়ামী' কিংবা 'লীগ' শব্দ জুড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানাও ব্যবহার করছে। যাদের প্রধান কাজ তদবির ও চাঁদাবাজি। রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশিষ্টজন বলছেন, এইসব 'দোকানদারি' বন্ধ করতে না পারলে দেশে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আদর্শিক রাজনীতি। ত্বরান্বিত হবে দুর্নীতি
আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে গজিয়ে ওঠা ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি বিষয় কার্যকরের প্রস্তাব দিয়েছেন ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু। তিনি ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর নাম প্রকাশ, রাজনীতির নামে অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার সতর্কীকরণ এবং সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছেন।
সমকালের সঙ্গে আলাপকালে বর্ষীয়ান রাজনীতিক আমির হোসেন আমু বলেন, ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ডে রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতি। সেই সঙ্গে চাঁদাবাজি, ধান্ধাবাজি, অত্যাচার-নির্যাতন ও দুর্নীতি আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে। এখনই এদের রুখতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে 'বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ' নামে একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের আত্মপ্রকাশ এবং জেলা-উপজেলাসহ বিদেশ শাখায় সংগঠনটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্টার ছড়িয়ে দেওয়ার পর ভুঁইফোঁড় সংগঠনের অসাধু তৎপরতার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরই ধারাবাহিকতায় ওই সংগঠনের সভাপতি হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির পদ হারান।
আওয়ামী লীগের কয়েকজন নীতিনির্ধারক নেতা জানিয়েছেন, গত এক যুগে অসংখ্য রাজনৈতিক টাউটের জন্ম হয়েছে। যারা আগে-পরে 'আওয়ামী' কিংবা 'লীগ' শব্দ জুড়ে দিয়ে বাহারি নামের ভুঁইফোঁড় ও প্যাডসর্বস্ব সংগঠন গড়ে তুলে চাঁদাবাজি ও ধান্ধাবাজি করছে। তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবার, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার নাম ব্যবহার করেও ভুঁইফোঁড় সংগঠন গড়ে তোলার সাহস দেখাচ্ছে।
আমির হোসেন আমু বলেন, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং বিভিন্ন উপ-কমিটির বাইরে অন্য কোনো নামের সঙ্গে 'লীগ' অথবা 'আওয়ামী' শব্দ জুড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুঁইফোঁড় সংগঠনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের প্রশংসা করেন আমির হোসেন আমু। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে দলের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে এ ধরনের কাজে সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক। এমনটা হলে ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর উদ্যোক্তারা পিছু হটবে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু আরও বলেন, বিরোধী দলে থাকাকালে আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতিতে ভুঁইফোঁড় সংগঠনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ওই সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্বে থাকায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ত হওয়ার প্রশ্নও আসেনি। কিন্তু ক্ষমতায় থাকলে কিছু জটিলতা তৈরি হয়। সুবিধাভোগী শ্রেণি ও বসন্তের কোকিলরা নানা নামে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টায় লিপ্ত হয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় নানান আগাছা-পরগাছা।
বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক আরও বলেন, আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে কেবল চাঁদাবাজি ও ধান্ধাবাজির উদ্দেশ্যে ভুঁইফোঁড় সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসকে কেন্দ্র করে ওরা চাঁদাবাজির মহোৎসব করে। স্মরণিকা প্রকাশের নামে বিজ্ঞাপন সংগ্রহের ধান্ধায় নামে। এরা কখনই ন্যায়-নীতির ধার ধারে না। আদর্শিক রাজনীতি করে না। কথিত ওই সংগঠনগুলো মাঝে মধ্যে দু-একটি কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে গণমাধ্যমে কাভারেজও পায়। এই সুযোগটিই নেয় নামসর্বস্ব সংগঠনগুলোর কথিত নেতারা। সুযোগ পেলেই অত্যাচার-নির্যাতন করে। জোর-জুলুম করে। সব মিলিয়ে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়।
তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের নামে কোনো সংগঠন প্রতিষ্ঠা কিংবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গেলে ট্রাস্টের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু রাতারাতি গড়ে ওঠা ভুঁইফোঁড় ও নামসর্বস্ব সংগঠনগুলো এই নিয়মও মানছে না। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এসব সংগঠনের কার্যক্রমে প্রচণ্ড অসন্তোষ প্রকাশ করলেও তোয়াক্কাই করছেন না 'রাজনৈতিক দোকান' হিসেবে পরিচিত সংগঠনগুলোর নেতারা। সংগঠনের কার্যালয় হিসেবে তারা আওয়ামী লীগের ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করার মতো দুঃসাহসও দেখাচ্ছে। বড় বড় ব্যানার-পোস্টারে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি ব্যবহার করছে।
এসব অপকর্মের কারণে আদর্শিক রাজনীতির ক্ষতি হচ্ছে বলে মনে করেন ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র। তিনি বলেন, আশার কথা হলো, ভুঁইফোঁড় সংগঠনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। এখন ভুঁইফোঁড় সংগঠনগুলোর নাম প্রকাশ করা উচিত। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকার কথা জানানো উচিত। সেই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থাও নিতে হবে।

আরও পড়ুন

×