ব্যাংক খাতে সংকট :বিশেষ মন্তব্য

শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক

প্রকাশ: ০১ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ

ব্যাংক খাতের মূল সমস্যা বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ। সম্প্রতি খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ শ্রেণীকরণের নীতিমালা শিথিল করেছে।ব্যাংক খাতের নানা সংকট ও সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক দুই গভর্নরের বিশেষ মন্তব্য-

অন্যান্য খাতের তুলনায় বাংলাদেশের আর্থিক খাত সুশৃঙ্খল ছিল। তবে ২০১১-১২ সাল থেকে ব্যাংক খাতে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। এখন যে পর্যায়ে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। এ অবস্থা থেকে বেরোতে না পারলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত হবে। ব্যাংক খাত অর্থনীতির স্নায়ুর মতো। এটি সুশৃঙ্খল না হলে দেশের শিল্প-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় প্রভৃতির ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব দেখা দেয়।

ব্যাংক খাতে যেসব নিয়ন-কানুন ও আইন আছে তা ভালো। তবে গত ৫-৭ বছর ধরে এগুলোর যথাযথভাবে পরিপালন হচ্ছে না। আবার যেসব সংশোধনী ও পরিবর্তন আসছে তা গোষ্ঠীস্বার্থে। ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি- তিন পর্যায়েই ফাটল ধরেছে। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথেষ্ট দুর্বলতা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাসময়ে, যথাযথ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বেসিক ব্যাংক,

বিসমিল্লাহ, হলমার্ক, ক্রিসেন্ট গ্রুপসহ নানা কেলেঙ্কারি নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হতো। তা না করে 'আমরাও জানি' কিংবা 'দেখছি-দেখব' বলে সময়ক্ষেপণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাতে অযাচিত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ হচ্ছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের লোকজন প্রভাবিত হন। এই প্রভাব ব্যবস্থাপনার ওপরেও রয়েছে। অথচ ব্যাংক ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের একটি জায়গা। পেশাদারিত্বের সঙ্গে এর ব্যবস্থাপনা করতে হবে। রাজনীতিবিদরা যখন ব্যাংকে প্রভাব বিস্তার করেন, আমলারাও এর সুযোগ নেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বময় কর্তৃত্ব নেই। এখানে একটা দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে। পুরো ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ছেড়ে দেওয়া উচিত।

তৃতীয়ত, নিয়মগুলো প্রায়ই পরিবর্তন বা সংশোধন করা হচ্ছে। এ পরিবর্তন বা সংশোধন অর্থনৈতিক চাহিদা বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব বিবেচনায় হচ্ছে না। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ব্যবসায়ীদের চাপে করা হচ্ছে। এসব নির্দেশনা অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের নয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে এক পরিবার থেকে চারজন পরিচালক এবং মেয়াদ বাড়িয়ে পারিবারিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ সংশোধনীও যথাযথ কারণে হয়নি। এ সংশোধনী ব্যাংক খাতের সুশাসন ও শৃঙ্খলাবিরোধী। আবার কয়েক দিন পরপর ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১২ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের কথা বলা হচ্ছে। যেখানে সুদহার হবে ৭ শতাংশ কিংবা ৯ শতাংশ। সরকারের তরফ থেকে ঢালাওভাবে এসব কথা বললে সমস্যা আরও সংকটাপন্ন হয়। যারা ভালো গ্রাহক তারা নিরুৎসাহিত হন। এভাবে ঘোষণা না দিয়ে কিংবা আলাদা নীতিমালা না করে বরং প্রকৃত সমস্যা বিবেচনায় কেস টু কেস ভিত্তিতে সুবিধা দেওয়া যায়।

খেলাপি ঋণ হঠাৎ করে হয়, তা নয়। আস্তে আস্তে এটা বাড়ে। ব্যাংকাররা ঋণ অনেক সময় যাচাই-বাছাই করে দেন না। এখানে ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী উভয়েরই দায়িত্ব আছে। কেননা, কারও দুই কোটি টাকা পাওয়ার কথা, কিন্তু তাকে চার কোটি টাকা দিয়ে দিচ্ছে ব্যাংক। এতে তহবিল স্থানান্তর হয়ে যায়। যখন এক খাতের ঋণ অন্য খাতে চলে যায়, তখন খেলাপি হয়ে পড়ে। খেলাপি হলে ব্যাংকগুলো শক্তভাবে মোকাবেলা করে না। রুটিন কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়। আইনগতভাবে যেভাবে মোকাবেলা করা দরকার, তা করে না। বড় বড় ঋণ খেলাপি আদালতে গিয়ে নামকরা আইনজীবী নিয়োগ দেন। আর ব্যাংক সাধারণ রুটিন মেনে আইনজীবী নিয়োগ করে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে শক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া অর্থঋণ আদালতে বিপুল সংখ্যক মামলা জমে আছে। আদালতে আলাদা বেঞ্চ করে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিচার বিভাগ থেকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো, প্রচুর ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এত ব্যাংকের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমি গভর্নর থাকা অবস্থায় নতুন ব্যাংক দেওয়ার চাপ ছিল। তবে আমাদের বিবেচনা ছিল- চাহিদা থাকলে দেব। আর এখন রাজনৈতিক স্বার্থে ও গোষ্ঠী বিবেচনায় ব্যাংক দেওয়া হচ্ছে। এসব ব্যাংক বিশেষ কোনো সেবা বা প্রোডাক্ট এনেছে, তেমন নয়। গতানুগতিকভাবে কাজ করছে। সরকারের বড় বড় আমানতের জন্য ছুটছে। একটা অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সেবাও সাশ্রয়ী হয়নি। ঋণ দেওয়ার জন্য একই লোকের পেছনে সবাই ছুটছে। আবার কাউকে ঋণ না দিয়ে এক ব্যাংক ফিরিয়ে দিলে আরেক ব্যাংক দিয়ে দিচ্ছে। তেমন যাচাই-বাছাই করছে না। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থায় একটা চিড় ধরেছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

ব্যাংক খাতের সমস্যা সবার জানা। কারা সমস্যা সৃষ্টি করেছে, তাও অজানা নয়। এখন কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তাও কিছু কিছু জানা আছে। তবে সমন্বিত ও সুষ্ঠুভাবে পদক্ষেপ নিতে একটা ব্যাংকিং কমিশন করতে হবে। সরকার বলছে, বহু কমিশন হয়েছে। তবে বহু কমিশন আর ব্যাংকিং কমিশন এক নয়। সৎ, দক্ষ এবং যাদের পূর্বের রেকর্ড ভালো; অর্থনীতি, ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে যারা ভালো বোঝেন, এমন লোকদের নিয়ে একটা অস্থায়ী কমিশন করতে হবে। এই কমিশন ব্যাংকার, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার, আমানতকারী, নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ সবার সঙ্গে আলাপ করে সমস্যা সমাধানের সুপারিশ করবে। সময়ে সময়ে কিছু নিয়মনীতি যুগোপযোগী করার পরামর্শ দেবে। সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সরকারের বিশেষ উদ্যোগ দরকার। রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে আমরা যত ধরনের কথাই বলি, তাতে কাজ হবে না।



লেখক :বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর