ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

সাত ব্যাংকে সুদ আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি

সাত ব্যাংকে সুদ আয়ের  চেয়ে ব্যয় বেশি

.

ওবায়দুল্লাহ রনি 

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:২২

ব্যাংকের মুনাফা করার প্রধান উৎস সুদ থেকে আয়। এর বাইরে সার্ভিস চার্জ, এলসি কমিশনসহ বিভিন্ন উপায়ে আয় করে ব্যাংক। সরকারি-বেসরকারি সাতটি ব্যাংক সুদ থেকে যে আয় করছে, ব্যয় হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। মূলত উচ্চ খেলাপির কারণে উল্লেখযোগ্য ঋণের বিপরীতে আয় দেখাতে না পারলেও পুরো আমানতের বিপরীতে সুদ হিসাব হচ্ছে। দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ব্যাংকগুলো আমানত নিচ্ছে চড়া সুদে। 
সংশ্লিষ্টরা জানান, খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংক আয় দেখাতে পারে না। আবার কোনো ব্যাংক যখন খারাপ অবস্থায় পড়ে তখন অনেকে আমানত তুলে নেয়। নতুন করে তেমন কেউ টাকা রাখতে চায় না। যে কারণে খারাপ অবস্থায় পড়া ব্যাংক আমানতকারী আকর্ষণে উচ্চ সুদ অফার করে। ঋণসহ বিভিন্ন জালিয়াতিতে আলোচিত ব্যাংকেই খেলাপি বেশি। বেনামে বের করা কিংবা কমিশন নিয়ে দেওয়া ঋণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আর আদায় হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী গত অক্টোবরে একটি ব্যাংক সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৯৩ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করতে পেরেছে। অথচ কোনো কোনো ব্যাংক ১২ থেকে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত নিয়েছে। মূলত এভাবে নেওয়া টাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, অফিস ভাড়া, ইউটিলি বিলসহ বিভিন্ন দৈনন্দিন খরচ মেটাচ্ছে ব্যাংকগুলো।
আমানতের গড় সুদের চেয়ে ঋণের গড় সুদ বেশি হওয়া ব্যাংকগুলো হলো– রাষ্ট্রীয় মালিকানার বেসিক ও বিডিবিএল এবং  বেসরকারি খাতের পদ্মা, আইসিবি ইসলামিক, ন্যাশনাল, বাংলাদেশ কমার্স এবং বিদেশি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। গত বছরের একই সময়ে এসব ব্যাংকের মধ্যে ন্যাশনাল ও বিডিবিএল মুনাফায় ছিল। বিভিন্ন জালিয়াতির কারণে এসব ব্যাংকই বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বেসিক ব্যাংক গড়ে ৬ দশমিক ২২ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। একই মাসে ঋণের গড় সুদহার ছিল ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এতে করে গড় লোকসান হয়েছে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির সুদের বিপরীতে লোকসান ছিল ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ সুদে আমানতের বিপরীতে গড়ে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়েছে। এতে ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে যেখানে ব্যাংকটির সুদ আয় ছিল শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ।

বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক সেপ্টেম্বরে ১০০ টাকার বিপরীতে ১৪ পয়সা লোকসান দিয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকটির সুদ আয় ছিল শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ। পদ্মা ব্যাংক গড়ে ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ সুদে আমানত নিলেও ঋণের গড় সুদ ছিল ৩ দশমিক ১১ শতাংশ।  লোকসান হয়েছে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ আমানত নিলেও ঋণ থেকে আয় ১ দশমিক ৫২ শতাংশ। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক গড়ে ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ আমানত নিলেও ঋণ বিতরণ করছে ৪ দশমিক ২১ শতাংশ। এতে করে লোকসান হচ্ছে ৬০ পয়সা। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের আমানতে ২ দশমিক ৬২ শতাংশ খরচ হলেও ব্যাংকটির কোনো আয় নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী শতাংশ বিবেচনায় খেলাপি ঋণের শীর্ষে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির ১ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ঋণের ৯৮ দশমিক ১৮ শতাংশ খেলাপি। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৭৯১ কোটি টাকা ঋণের ৮৭ শতাংশই খেলাপি। বেসিক ব্যাংকে আব্দুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় দেওয়া অনিয়মের ঋণের বেশির ভাগ আর ফেরত আসছে না। বেসিক ব্যাংকের ১২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা ঋণের ৬৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ খেলাপি।

পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ঋণের প্রায় ৬৪ শতাংশ এখন খেলাপি। বাংলাদেশ কমার্সের ২ হাজার ২৮৯ কোটি টাকার ৬০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ খেলাপি। বিডিবিএলের ২ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা ঋণের ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। আর ন্যাশনাল ব্যাংকের ৪২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩২ শতাংশ খেলাপি দেখানো হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির ৫৮ শতাংশ ঋণের বিপরীতে কোনো আয় নেই। তবে তিন থেকে চার বছর গ্রেসপিরিয়ড কিংবা সুদ চার্জ না করাসহ বিভিন্ন উপায়ে এসব ঋণ নিয়মিত দেখানো হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×