শরিয়তসম্মত বিনিয়োগের কথা বলে মানুষের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান মুফতি রাগীব আহসানকে এক সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠান এহসান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডকে দেওয়া হয় 'সফল সমবায় সমিতি সনদপত্র'। ২০১৪ সালে ৪৩তম জাতীয় সমবায় দিবস উপলক্ষে দেওয়া হয়েছিল ওই সনদপত্র।

সনদপত্রে পিরোজপুরের তখনকার জেলা প্রশাসক এ কে এম শামিমুল হক ছিদ্দিকীর স্বাক্ষর রয়েছে। বর্তমানে তিনি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। এ ব্যাপারে তিনি সমকালকে বলেন, 'প্রতিটি বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট খাতের সফল ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে নানারকম পুরস্কার বা সনদ দেওয়া হয়। এগুলো সেই বিভাগের কর্মকর্তারাই সুপারিশ করেন। মূলত তারাই যাচাই-বাছাই করেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে তা আসে জেলা প্রশাসকের কাছে। যখনকার কথা বলা হচ্ছে, তখন কারা সনদ পেয়েছিল তা এখন মনেও নেই। তবে এটা ঠিক যে, তখন তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। নইলে তাদের নাম ওই তালিকায় আসত না।'

মুফতি রাগীব আহসানকে এক সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১০ এর একটি দল গত ৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তোপখানা রোড থেকে রাগীব আহসান ও তার এক ভাইকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় কিছু ভাউচার বই ও মোবাইল ফোন। অন্যদিকে পিরোজপুরে তার দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ।

পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাঈদুর রহমান সমকালকে বলেন, 'প্রতারণার অভিযোগে রাগীব আহসান ও তার তিন ভাইয়ের বিরুদ্ধে করা পাঁচটি মামলার তদন্ত চলছে। এর মধ্যে একটি মামলায় রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অধিক মুনাফা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তারা মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তারা আলেম-ওলামাদের দিয়েও প্রচারণা চালিয়েছেন।'

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, একটি বহু স্তর বিপণন (এমএলএম) প্রতিষ্ঠানে ৯০০ টাকা বেতনে চাকরি করা রাগীব পরে নিজেই ব্যবসা খুলে বসেন। শরিয়তসম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগ ও প্রতিলাখে মাত্রাতিরিক্ত লাভ দেওয়ার প্রচারণা চালিয়ে তিনি ফাঁদ পাতেন। ১০ হাজার গ্রাহক নিয়ে যাত্রা শুরু করা তার প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকসংখ্যা এখন লক্ষাধিক। গ্রাহকদের অভিযোগ ও গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তিনি প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে তিনি সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতিকে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি দেশ-বিদেশের আলেমদের দিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের নামে ওয়াজের আড়ালে প্রচারণা চালাতেন। দুই দফায় তিনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আলেম এনে এহসান গ্রুপের পক্ষে প্রচারণা চালান। এছাড়া দেশের পরিচিত বেশ কয়েকজন ইসলামি বক্তাও ওয়াজের নামে প্রচারণায় অংশ নেন। ধর্মকে ব্যবহার করে এভাবেই তিনি সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

এহসান গ্রুপে বিনিয়োগ করে প্রতারণার শিকার হওয়া ব্যক্তিরা সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও পিরোজপুরসহ কয়েকটি জেলায় মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ করেন। কয়েকজন ভুক্তভোগী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও অভিযোগ করেন। এ ঘটনায় পিরোজপুরে মামলা করেন ভুক্তভোগী এক গ্রাহক। পরে আরও চারটি মামলা হয়।

একটি মামলার বাদী হারুন-অর-রশিদ জানান, তার ১০ লাখ টাকাসহ তার আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের কাছ থেকে ৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন রাগীব। এছাড়া তিনি পিরোজপুর, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, খুলনা, ঝালকাঠিসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে লক্ষাধিক গ্রাহকের প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের যেখানে প্রতারক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেখানে তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলে। প্রশাসন যাকে সনদপত্র দেয়, তাকে সহজেই বিশ্বাস করে মানুষ। এতে রাগীব আহসানের প্রতারণার জাল বিস্তার করা সহজ হয়েছে।