মেয়াদি আমানতে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়ার পর এবার ঋণের সুদহার বাড়াচ্ছে ব্যাংকগুলো। গাড়ি, বাড়ি, বড় শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৬ থেকে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা সুদহার এখন বাড়ানো হচ্ছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার ফলে কোনো ব্যাংক ৯ শতাংশের বেশি সুদ নিতে পারবে না। মেয়াদি আমানতে মূল্যস্ফীতির নিচে সুদ দেওয়া যাবে না- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা কার্যকরের পর ঋণের সুদহার বাড়ছে। লোকসান ঠেকাতে সুদ না বাড়িয়ে উপায় নেই বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েক বছর ধরে এমনিতেই বিনিয়োগে ধীরগতি ছিল। করোনা শুরুর পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। শিল্প, সেবাসহ বিভিন্ন খাতে ঋণ চাহিদা অনেক কমায় অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে বিপুল পরিমাণের উদ্বৃত্ত অর্থ জমেছে। এই অর্থ বিনিয়োগে নিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ভোক্তা ঋণ বাড়ানোর একটা চেষ্টা শুরু হয়। বেশিরভাগ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশিত ৯ শতাংশের কম সুদে ভোক্তা ঋণ দিচ্ছিল। অথচ গত বছর সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা ঠিক করে দেওয়ার আগে এসব ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৬ শতাংশ সুদ ছিল। এখন মেয়াদি আমানতে সুদহার বাড়ানোর পর অধিকাংশ ব্যাংক ভোক্তাসহ অন্যান্য ঋণে সুদ বাড়াতে শুরু করেছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, আমানতের খরচ বৃদ্ধির ফলে ঋণের সুদহার বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তারা ভোক্তা ঋণ ৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলেন, যা এখন আর সম্ভব নয়। আবার বড় শিল্পে ঋণের সুদহার ৬ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রেও এখন সুদ বাড়াতে হবে। রাতারাতি সব ব্যাংক সুদহার হয়তো বাড়াবে না। তবে ধীরে ধীরে বাড়বে। আমানতের সুদ বাড়ানোর পর ঋণে না বাড়িয়ে উপায় নেই।

জানা গেছে, বেসরকারি খাতের ব্র্যাক, ডাচ্‌-বাংলা, ইস্টার্ন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, শাহ্‌জালাল ইসলামীসহ অনেক ব্যাংক গাড়ি, বাড়ি বা ব্যক্তি ঋণে সুদ নামিয়ে এনেছিল ৬ থেকে ৭ শতাংশে। এসব ব্যাংকসহ বেশিরভাগ ব্যাংক বড় শিল্পে ৬ থেকে ৮ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছিল। সব মিলিয়ে গত জুলাইয়ে ব্যাংক খাতের ঋণের গড় সুদহার দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৩০ শতাংশে। গত বছরের এপ্রিলে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অন্য সব ঋণে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৯ শতাংশ ঠিক করার আগের মাস মার্চে গড় সুদহার ছিল ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ঋণের পাশাপাশি আমানতের সুদহার কমে গত জুলাইয়ে ৪ দশমিক ১১ শতাংশে নামে। গত বছরের মার্চে যা ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ ছিল। আগস্টে ব্যাংক খাতের গড় সুদহারের তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে অধিকাংশ ব্যাংক ব্যক্তি আমানতের সুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির বেশি তথা ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ বা বেশি নির্ধারণ করেছে।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের এক শাখা ব্যবস্থাপক বলেন, যে কোনো সময় টাকার প্রয়োজন হতে পারে- এমন গ্রাহকদের মধ্যে এখন সঞ্চয়ী হিসাবের পরিবর্তে তিন মাস মেয়াদি আমানত রাখার প্রবণতা বাড়ছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোতে কম সুদের আমানত কমছে। এ পরিস্থিতিতে ঋণের সুদ না বাড়ালে লোকসানে পড়তে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ঋণ চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ব্যক্তি আমানত নিতে অনেক ক্ষেত্রে অনীহা দেখাচ্ছিল। কোনো কোনো ব্যাংক ব্যক্তি আমানত নিরুৎসাহিত করতে তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি আমানতে ২ থেকে ৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছিল। অথচ দেশের বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের কাছাকাছি। মূল্যস্ফীতির বিবেচনা এবং বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ হিসাব করলে একজন ব্যক্তি ব্যাংকে টাকা রাখলে তার প্রকৃত আয় অনেক কম হতো। যে কারণে গত ৮ আগস্টে এক নির্দেশনার মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ের তিন মাস বা এর বেশি মেয়াদি আমানতে মূল্যস্ফীতির কম সুদ না দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। এরই মধ্যে বেশিরভাগ ব্যাংক আমানতের নতুন সুদহার কার্যকর করেছে।

ব্যক্তি আমানতে নিরুৎসাহিত করে অনেক ব্যাংক আন্তঃব্যাংক থেকে ১ শতাংশের কম সুদে ধার নিয়ে নিজেদের চাহিদা মেটাচ্ছিল। এ রকম প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতের জন্য খারাপ অবস্থা তৈরি করতে পারে। আবার বাজারে উদ্বৃত্ত থাকলে তা শেয়ারবাজারসহ বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাতে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। এমন ধারণা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক গত মাস থেকে স্বল্পমেয়াদি বিলের বিপরীতে বাজার থেকে টাকা তুলছে।