এক দশক আগের আর্থিক কেলেঙ্কারির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারছে না রাষ্ট্র মালিকানার বেসিক ব্যাংক। একদিকে জালিয়াতির মাধ্যমে দেওয়া ঋণ আদায় হচ্ছে না, অন্যদিকে নতুন করে ভালো ব্যবসাও করতে পারছে না। ফলে কর্মীদের বেতন কমানোর পরও লোকসান পিছু ছাড়ছে না। ব্যাংকটি বাঁচাতে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তেমন কাজ হয়নি। এখন সংকট কাটাতে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর চায় বেসিক ব্যাংক। জানা গেছে, বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের কারণে নতুন করে গ্রাহক টানতে পারছে না বেসিক ব্যাংক। অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টায় সায় মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহক আকর্ষণে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরের চিন্তা করছে। আর এ বিষয়ে প্রস্তুতির জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ভাবমূর্তি সংকট কাটাতে না পারায় ২০১২ সালের পর থেকে টানা লোকসান গুনছে বেসিক ব্যাংক। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মুনাফায় থাকা ব্যাংকটি ২০১৩ সালে প্রথম ৫৩ কোটি টাকা লোকসান দেয়। এরপর ২০২০ সাল পর্যন্ত গত আট বছরে লোকসান দিয়েছে তিন হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে লোকসান হয়েছে আরও ৪০০ কোটি টাকা।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ১৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে তিন হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুর বিদায়ের পর সরকার থেকে ব্যাংকটিকে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এরপরও গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূলধন ঘাটতি রয়েছে দুই হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা।

কেন ইসলামী হতে চায়: শরিয়াহ ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর বিষয়ে কমিটি গঠনের কারণ হিসেবে ব্যাংকের নথিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো থাকলেও সরকারি মালিকানাধীন পূর্ণাঙ্গ কোনো ইসলামী ব্যাংক নেই। এমন প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বেসিক ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করতে চায়। প্রচলিত ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরের লক্ষ্যে গঠিত কমিটিকে আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে এমডি বরাবর প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারও কমিটিকে কাজ করতে বলা হয়েছে।

জানা গেছে, গত ১৬ নভেম্বর কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুর রহিমকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন অপর দুই ডিএমডি নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ ও আবু মো. মোফাজ্জেল। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়সহ সব মহাব্যবস্থাপককে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। ব্যাংক গঠিত কমিটির কার্যপরিধিতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, প্রচলিত ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তর হয়েছে এ রকম অন্তত তিনটি ব্যাংকের তথ্য নিতে হবে। সে আলোকে বেসিককে শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তর প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে। সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব নির্ণয় করতে হবে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি লাগবে, রিপোর্টে তা উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরের জন্য বেসিক ব্যাংকে কী পরিবর্তন আনতে হবে, তার বিস্তারিত জানাতে হবে। ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

জানা গেছে, পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকে কমিটি কাজ করছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রথমে তা পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটিতে উত্থাপন করা হবে। সেখানে অনুমোদনের পর নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে উত্থাপন করা হবে। এরপর সুপারিশসহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকছে অনেক ব্যাংক। চলতি বছর স্ট্যান্ডার্ড ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহ ব্যাংকে রূপান্তর হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক রয়েছে। এর বাইরে প্রচলিত ধারার ৯টি ব্যাংকের ৪০টি ইসলামী শাখা এবং ১৩টি ব্যাংকের ১৯৪টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে। মুনাফা, রেমিট্যান্স, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসাসহ অন্যসব দিক থেকেই প্রচলিত ধারার ব্যাংকের তুলনায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি বেশি।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, ব্যাংকটির ভাবমূর্তির সমস্যা আছে। একটি পরিবর্তন হলে সবার মাঝে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে। তবে ব্যাংকটির মালিক যেহেতু সরকার, সুতরাং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারই নেবে। তারা বোঝার চেষ্টা করছেন, অন্যরা কীভাবে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে ঋণ আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিছু ঋণ আছে আদায় অযোগ্য। যেসব ঋণ আদায় করা সম্ভব তাদের মাঝে একটা বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে হবে। ফলে আগামী দু-এক বছরের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসবে।

ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাসেম এ বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদে প্রস্তাব না আসায় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আর কমিটির আহ্বায়ক মো. আব্দুর রহিম বলেন, উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে কমিটি কাজ করছে। এখনও রিপোর্ট চূড়ান্ত হয়নি।

যা ঘটেছিল বেসিক ব্যাংকে: জাতীয় পার্টির সাবেক সাংসদ আব্দুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব থাকাকালে বেসিক ব্যাংকে গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখার মাধ্যমে ঋণের নামে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়। আব্দুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসার পর থেকে ঋণ বাড়াতে থাকেন দ্রুতগতিতে। শুরুর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক চুপ ছিল। পরে বিভিন্ন পক্ষের সমালোচনার মুখে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। ২০১৪ সালে আব্দুল হাই বাচ্চুকে পদত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। এ ছাড়া তৎকালীন এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়।