বগুড়ায় নির্মাণাধীন ভবন মেঘ সিটি কমপ্লেক্সের নামে ফার্স্ট ফাইন্যান্স থেকে ১৫ কোটি টাকা ঋণ দিতে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত এমডি তুহিন রেজা। 

তবে এক কোটি টাকার বেশি ঋণ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তির বাধ্যবাধকতা থাকায় বাধে বিপত্তি। ফার্স্ট ফাইন্যান্সের অনাপত্তির আবেদন দু'দফা নাকচ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর সিরাজগঞ্জ-১ আসনের এমপি তানভীর শাকিল জয়ের নামে মানবিক বিবেচনায় এ ঋণে অনাপত্তির অনুরোধ সংবলিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে একটি ভুয়া চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে এমপির স্বাক্ষর জাল করা হয়। 

জালিয়াতির এ ঘটনা উদ্ঘাটন করার পর বিস্তারিত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সিরাজগঞ্জ-১ আসনের এমপি তানভীর শাকিল জয় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে। গত ৫ সেপ্টেম্বর তার নামে চিঠি আসে বাংলাদেশ ব্যাংকে। সেখানে মানবিক বিবেচনায় ঋণটি ছাড়ের অনুরোধ করা হয়। 

এই চিঠির সত্যতা যাচাইয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর এই এমপিকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠির জবাবে তানভীর শাকিল জয় জানান, বর্ণিত পত্রটির বিষয় ও প্যাড তার অফিস থেকে ইস্যু করা হয়নি। এছাড়া স্বাক্ষরও তার নয়। এটি একটি প্রতারণামূলক পত্র। তার ইমেজ নষ্ট করার জন্য এরূপ স্ব-ব্যাখ্যা করা পত্র কেউ বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েছে। 

এ বিষয়ে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তাকে অবহিত করার জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করেন।

এ ঘটনা উল্লেখ করে সম্প্রতি সিআইডিকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ। 

চিঠিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন জালিয়াতি ও আর্থিক সূচকের দুর্বলতার কারণে ফার্স্ট ফাইন্যান্স থেকে এক কোটি ও তার চেয়ে বেশি অঙ্কের ঋণ বিতরণের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি আমজাদ হোসেনের অনুকূলে মেঘ সিটি কমপ্লেক্স নামে একটি কমার্শিয়াল ভবন নির্মাণের জন্য ১৫ কোটি টাকা ঋণে অনাপত্তির জন্য পাঠানো হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। অনাপত্তির চিঠিতে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত এমডি তুহিন রেজা। 

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ১৬ মার্চ তা নাকচ করে চিঠি দেয়। এরপর গত ১৫ জুন এই আবেদন পুনর্বিবেচনার জন্য আবার চিঠি দেন তুহিন রেজা। 

তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, পুনর্বিবেচনার আবেদনে উল্লেখিত স্থাপনার সঙ্গে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিবরণী অসঙ্গতিপূর্ণ। যে কারণে গত ২১ জুন আবার নামঞ্জুর করে চিঠি দেওয়া হয়। 

এরপর ​গত ৫ সেপ্টেম্বর সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয়ের প্যাড ও স্বাক্ষরে একটি চিঠি আসে বাংলাদেশ ব্যাংকে। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে মতামত চেয়ে তানভীর শাকিল জয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন এই চিঠি ও স্বাক্ষর ভুয়া বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ভারপ্রাপ্ত এমডি মেঘ সিটি কমপ্লেক্সের নামে ঋণ দিতে নানা উপায়ে চেষ্টা করলেও তিনি বা তার প্ররোচনায় অন্য কেউ এই চিঠি দিয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তুহিন রেজা ফার্স্ট ফাইন্যান্সের এমডি হতে বেশ আগ থেকে বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। অনিয়ম, জালিয়াতির অভিযোগ থাকায় তিন দফা তার এমডি নিয়োগের আবেদন নাকচ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

সর্বশেষ গত ১৫ মার্চ তৃতীয় দফা আবেদন নাকচ করে প্রতিষ্ঠানটির একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এমডি নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর উত্তরা ব্যাংকের সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেনকে নিয়োগ দিয়েছে ফার্স্ট ফাইন্যান্স। গত ১৮ জুলাই মোশারফ হোসেন এমডি পদে যোগ দেন। 

বিভিন্ন পক্ষের অসহযোগিতায় চার মাস না যেতেই গত ১৬ নভেম্বর তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। তবে এ রকম অভিজ্ঞ ব্যক্তির পদত্যাগ কার্যকর না করতে পরিচালনা পর্ষদে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্যের জন্য তুহিন রেজার ব্যক্তিগত মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে যোগাযোগ করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। আর মেঘ সিটি কমপ্লেক্সের কর্ণধার আমজাদ হোসেনের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।