বরিশালে মেঘনার ভাঙন

আশ্রয়ণেও ঠিকানা স্থায়ী হলো না ভূমিহীনদের

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

বরিশালে মেঘনার ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতঘর-সংগৃহীত

বরিশালে মেঘনার ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে ভূমিহীনদের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতঘর-সংগৃহীত

'নদীর কূলে বাঁধলাম ঠিকানা, সেই ঠিকানায় থাকা হইল না'- গানের এ লাইনটির সঙ্গে মিলে গেছে দিনমজুর শাহজাহান-দেলোয়ারসহ মেঘনাতীরের অনেক হতদরিদ্রের জীবনচিত্র। ভূমিহীন এসব মানুষের ঠিকানা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সেনবাহিনীর বাস্তবায়ন করা আশ্রয়ণ প্রকল্পে। রাক্ষসী মেঘনার ভাঙন তাদের সে ঠিকানা কেড়ে নিয়েছে। মেঘনা আবারও ঠিকানাহীন করেছে শাহজাহানদের। আর কোনোদিন স্থায়ী ঠিকানা পাবেন কিনা, তা পুরোপুরি অনিশ্চিত।

এক বছর আগে ৮০টি ভূমিহীন পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা হয়েছিল বরিশালের হিজলা উপজেলার ধুলখোলা ইউনিয়নের কুঞ্জেরহাট আশ্রয়ণ প্রকল্পে। মেঘনার ভাঙনে এরই মধ্যে ৩৫টি পরিবার তাদের বসতঘর হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। তাদের এখন ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে খাসজমি কিংবা অন্যের জমিতে কোনো রকমে বসবাস। চলমান ভাঙনে অন্য পরিবারগুলোকে শিগগির আশ্রয়ণ ছাড়তে হবে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ঠিকানা হারানো শাহজাহান আক্ষেপ করে বলেন, 'সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাতুব্বরের দয়ায় আশ্রয়ণে অ্যাকটা ঘর পাইছালাম। ৬/৭ মাস থাকতে পারছি। ঘরডা নদীতে ভাইঙ্গা নেছে। ঈদের আগে (ঈদুল আজহা) পরিবার লইয়া গ্যারামে আরেকজনের জাগায় থাকতেছি।'

শাহজাহান আফসোস করে জানান, ভাঙনের খবর জেনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তিনি কিছু সাহায্যের জন্য ভোটার আইডি কার্ড দিতে বলেছেন। পুনরায় ঘর পাবেন কিনা, জানতে চাইলে ইউএনও বলেছেন, এটা উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। তিনি আপাতত কিছু সাহায্য করতে পারবেন। একইভাবে আফসোস করেন ভাঙনে আশ্রয়ণে ঘর হারানো দেলোয়ার হোসেন। তিনিও এখন থাকেন অন্যের বাড়িতে।

ধুলখোলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও হিজলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইকবাল হোসেন মাতুব্বর বলেন, 'ভূমিহীনদের আশ্রয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পের আওতায় তার ইউনিয়নে ২০১৭ সালে ৩টি আশ্রয়ণ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কুঞ্জেরহাট আশ্রয়ণ প্রকল্পটি স্থাপিত হয়েছিল বেড়িবাঁধের ভেতরের অংশে। তখন নদীর দূরত্ব ছিল কমপক্ষে ১ কিলোমিটার দূরে। মেঘনার তীব্র ভাঙনে বেড়িবাঁধ তছনছ হয়ে আশ্রয়ণের ১৬টি ব্যারাকের (প্রতিটি ব্যারাকে ৫টি পরিবার থাকার ব্যবস্থা) মধ্যে ৭টি ব্যারাক মেঘনায় বিলীন হয়েছে। বাকি ৯টিও বিলীন হওয়ার পথে।

ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথের মিয়ারহাট চ্যানেল স্বাভাবিক করার জন্য গত বছর ৯টি ড্রেজার দিয়ে খনন করা হয়। এরপরই পানির বাঁক ঘুরে উত্তাল মেঘনার ঢেউ আছড়ে পড়ছে ধুলখোলা ইউনিয়নের তীরে। ফলে সর্বত্র ভাঙন বেড়েছে।

হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বকুল চন্দ্র কবিরাজ আশ্রয়ণ পরিদর্শন করার কথা জানিয়ে বলেন, 'আশ্রয়ণ প্রকল্পের বর্তমান অবস্থার ছবি এবং সার্বিক অবস্থার কথা লিখিতভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং জেলা আশ্রয়ণ প্রকল্প দপ্তরে জানানো হয়েছে। পাউবোতে আমি ফোনও করেছি। দ্রুত পাউবো এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে আশা প্রকাশ করছি।'