ভারতে রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দাবি

ইলিশ প্রচুর ধরা পড়ায় দরপতন, বিপাকে ব্যবসায়ী জেলেরা

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০   

পুলক চ্যাটার্জি, বরিশাল

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ থেকে এক বছর হলো ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। দেশের চাহিদা মেটাতে সরকার ২০১২ সাল থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ইলিশ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তবে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি ইলিশ মোকামের ব্যবসায়ীদের মতে, রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রতিবছর মৌসুমে হাজার হাজার টন ইলিশ চোরাই পথে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতে পাচার হতো। সে কারণে ইলিশের বাজার মৌসুমেও চাঙ্গা থাকত। ওই ব্যবসায়ীরা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে স্থল সীমান্ত দিয়ে ভারতে ইলিশ ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে সাগরে ধরা পড়া বিপুল পরিমাণ ইলিশ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

পাইকারি ইলিশ ব্যবসায়ীরা জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে গভীর সাগরে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে। কিন্তু করোনা ও বন্যার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল, রাজধানী ঢাকা এবং বিভিন্ন জেলায় ইলিশের চাহিদা কম। ফলে বরিশালসহ দক্ষিণের মোকামগুলোতে ইলিশের দাম পড়ে গেছে। বৈধ রপ্তানি চালু থাকলে কিংবা চোরাই পথে পাচার সম্ভব হলে বর্তমান বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হতো ইলিশ। চলমান প্রেক্ষাপটে দরপতনের কারণে ইলিশের উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না জেলে ও আড়তদাররা।

ইলিশ রপ্তানিকারকদের সংগঠন ফিশ এপপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি বরিশালের অন্যতম ইলিশ ব্যবসায়ী অজিত দাস মনু সমকালকে বলেন, শনিবার বরিশাল মোকামে প্রায় ৪ হাজার টন সাগরের ইলিশ এসেছে। বৃহস্পতিবার থেকে প্রতিদিনই ইলিশের আমদানি বাড়ছে।  এ দিন ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকায়, যা গত বছর একই সময়ে অথবা রপ্তানি চালু থাকলে বিক্রি হতো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ দরে। আবার এক কেজির ওপরের সাইজের ইলিশ প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে ৩২ থেকে ৩৫ হাজার টাকা দরে, যা সাধারণত বিক্রি হয় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা দরে।

অজিত দাস মনুর মতে, দেশীয় মোকামে মাছের চাহিদা এখন কম। এ কারণে অস্বাভাবিকভাবে দাম কমে গেছে। সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে পশ্চিমবঙ্গে মাছ ঢুকতে পারছে না। তাই সাগরের ইলিশ নিয়ে ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। অজিত দাস ভারতে ইলিশ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বরিশাল ইলিশ মোকামের অন্যতম রপ্তানিকারক জহির সিকদার বলেন, এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। ধরাও পড়ছে ব্যাপক। তাই ২ মাসের জন্য ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলে জেলে-ব্যবসায়ীরা লাভবান হতেন।

জহির সিকদার জানান, যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। যার বিরূপ প্রভাব পড়েছে দক্ষিণের মোকামগুলোতে। করোনার কারণে অর্থনৈতিক যে মন্দা চলছে, তাতে ইলিশ জেলে ও ব্যবসায়ীরা দরপতনের কারণে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

দক্ষিণের অন্যতম ইলিশ মোকাম পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্য বন্দর। এ বন্দরের মৎস্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ হাওলাদার সমকালকে বলেন, ৬৫ দিনের অবরোধ শেষে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে গত এক মাসে জেলেরা সাগরে যেতে পারেননি। এখন শান্ত আবহাওয়ায় হাজার হাজার ট্রলার গভীর সাগরে গিয়ে ইলিশ ধরছে। শনিবার মহিপুর বন্দরে ৮ হাজার মণ ইলিশ আমদানি হয়েছে। কিন্তু করোনা ও বন্যার প্রভাবে অভ্যন্তরীণ বাজারে ইলিশের চাহিদা কম। যে কারণে সব সাইজের ইলিশের দাম প্রতি মণে কমেছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এ অবস্থায় রপ্তানি চালু হলে জেলে ও ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারতেন।

বরগুনার পাথরঘাটার মৎস্য বন্দরের ইলিশ আড়তদার মোস্তফা আলম জানান, চাহিদা কমে যাওয়ায় পাথরঘাটায় আগের মতো ইলিশের পাইকার আসেন না। শনিবার পাথরঘাটা বন্দরে ইলিশ এসেছে ৫ হাজার মণ। এ বিপুল পরিমাণ মাছ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় আড়তদাররা। কারণ সাগরের ইলিশ বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। বাজারে চাহিদা না থাকায় কম দামে তারা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। শনিবার পাথরঘাটায় ১ কেজি সাইজের ইলিশ সর্বোচ্চ ২৮ হাজার টাকায় প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে। রপ্তানি চালু থাকলে যা ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকায় বিক্রি হতো।

পাথরঘাটার ইলিশ ব্যবসায়ী সগীর হোসেন বলেন, রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হলে জেলে ও ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখতে পারতেন। এখন যেভাবে ইলিশ ধরা পড়ছে, তা যদি আরও এক মাস অব্যাহত থাকে, তাহলে বাজারে বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হবেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা। তাই ইলিশকেন্দ্রিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন ভারতে ইলিশ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।

বরিশাল জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস সমকালকে বলেন, ইলিশ রপ্তানির বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের কোনো ভূমিকা নেই। রপ্তানি কার্যক্রম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। ইলিশ ব্যবসায়ীরা রপ্তানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানালে মৎস্য অধিদপ্তরের সমর্থন থাকবে।