‌‘আল্লাহ আছুকক্কা ঘরখান উড়াইয়া লইয়া গেল’

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০   

নাসির লিটন ও নোমান সিকদার, চরফ্যাসন (ভোলা)

টর্নেডোতে ভেঙে পড়া ঘরের সামনে অসহায় দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা -সমকাল

টর্নেডোতে ভেঙে পড়া ঘরের সামনে অসহায় দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা -সমকাল

‘আগে ঘর করছি হেই দেনা এহনও শোধ অয় নাই। কয়দিন পর পাওনাদারেরা আইয়া ট্যাহার লাইগ্যা তাগাদা দেয়। এর মধ্যেই আল্লাহ আছুকক্কা (হঠাৎ) মাতর উরপের ঘরখান উড়াইয়া লইয়া গেল। অহন নতুন কইর‌্যা ঘর করমু কেমনে?’ 

কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন গত শনিবার রাতের টর্নেডোতে সর্বস্বহারা ভোলার চরফ্যাসনের আলসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধা বিবি জহুরা।

তিনি বলেন, ‘একবেলা খাওনের চাইল-ডাইল যোগাইতেই অনেক কষ্ট। হের মধ্যে নতুন ঘর করা সম্ভব অইব না। পেটের জ্বালায় খাইয়া বাচমু, না ঘর উঠাইয়া বৃষ্টি-বইন্যাত্তন রেহাই পামু? ভিডির (ভিটির) উরপেরত্তন ভাঙাচোরা মালামাল হরামু হেই বদলা (শ্রমিক) লওনের সামর্থও নাই। কই পামু কাড-খুডি, কে দিব মেস্ত্রীর মাইনা?’

আসলামপুর গ্রামের বেতুয়া সড়কের পাশেই বিবি জহুরার বসতি। অন্যের জমিতে ২ ছেলে আর স্বামী পরিত্যক্তা এক মেয়েকে নিয়ে বিবি জহুরার ববসাস। প্রায় ৩০ বছরের চেষ্টায় ২ ছেলে চারচালা ২টি টিনের ঘর করেছিল পরিবারের সুখ শান্তির জন্য। বড় ছেলে আব্বাস উদ্দিন অটোরিক্সা চালিয়ে ৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে ভালোই চলছিল। আর ছোট ছেলে জিয়াউদ্দিন দিনমজুর। মা, স্ত্রী সন্তানসহ ৫ জনের ভরনপোষণের দায়িত্ব তার। তার স্ত্রী আর মা বিবি জহুরা বর্গায় গাভী পালন করে সংসারে বাড়তি আয়ে সহায়তা করে থাকে। আর স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ে রেহানা সন্তানদের নিয়ে বাড়ির পশ্চিম ভিটিতে বসবাস করছেন। 

সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, বিবি জহুরার বাড়ির ৩টি ঘরই ভেঙে পড়ে আছে। রেহানার ঘরের ওপর পড়ে আছে বিশালাকৃতির একটি রেইনট্টি গাছ। এর নিচেই আসবাবপত্র, পরনের কাপড় আর নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল চাপা পড়া।

আব্বাস উদ্দিন জানান, ঘরচাপা পড়ার পরও বেঁচে থাকাই তাদের জন্য বাড়তি জীবন পাওয়া। শরীরের অবস্থা খারাপ থাকায় ভেঙে পড়া চাল-বেড়া সরাতে পারছেন না। 

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আল্লা চায়নাই ঘরে থাকি, তাই অহন রইদে হুগাই (শুকাই) আর বাইষ্যায় (বর্ষা) ভিজি। পোলা মাইয়া অহন মাইনষ্যের বাড়িত থাহে।’ 

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সোমবার সকাল থেকেই চরফ্যাসনে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে ঘরবাড়ি হারা মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। বৃষ্টির মধ্যেই আব্বাসাসের ছোট ভাই জিয়া উদ্দিনকে দেখা যায় ঘরের পাশে টং তুলে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে বসে আছেন। যেখানে দাঁড়ানোই কষ্টকর, সেখানে ৫/৬ জন লোকের অস্থায়ী বসবাস। খাওয়া নেই, নাওয়া নেই। 

চরফ্যাসন থেকে পূর্বদিকের বেতুয়া ঘাটের রাস্তার দিকে গেলেও দেখা যায় টর্নেডোর তাণ্ডব চিহ্ন। ১৮ ফুট চওড়া রাস্তার দক্ষিণ পাশের সবকিছু স্বাভাবিক। আর উত্তর পাশের ঘরবাড়ি গাছপালা লণ্ডভণ্ড। হাঠাৎ করে মাথা গোঁজার ঠাঁয় হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে অসহায় পরিবারগুলো। ধংসস্তুপ সরিয়ে কেউ কেউ নতুন করে ঘর তোলার প্রস্তুতি নিলেও অনেকের পক্ষে তাও সম্ভব হয়নি।

এদিকে ঝড়ের পরদিনই উপজেলা প্রশাসন শুকনো খাবার বিতরণ করেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পূণর্বাসনে রোববার সন্ধ্যায় স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল্লা আল ইসলামের পক্ষ থেকে পরিবার প্রতি ৫ হাজার টাকা করে বিতরণ করা হয়েছে।

চরফ্যাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পূণর্বাসনের জন্য গৃহনির্মাণ সহায়তা দেওয়া হবে।