অন্তত তিনশ' বছর জ্বেলেছে জ্ঞানের আলো। সে আলোক শিখা পেঁৗছেছে উপমহাদেশ ছাড়িয়ে চীন, তিব্বত, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে। তারপর আসে কৃষ্ণপক্ষ। দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়, ভারতের কর্ণাটক থেকে সেনদের আগমন ঘটে। পাল রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে তারা নিজেরাই শাসনভার গ্রহণ করে। তারা ছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুসারী। ফলে প্রথমেই আঘাত আসে বৌদ্ধ ধর্ম ও বিহারগুলোর ওপর। ব্যাপক হারে শুরু হয় বৌদ্ধ নিধন। অনেক ভিক্ষু বিহার ছেড়ে পালিয়ে যায় নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি দেশে। একে একে নিভতে থাকে দেউটি। তার পরও কিছু ভিক্ষু চেষ্টা চালায় বিহারটিকে সচল রাখতে। কিন্তু সেনদের হটিয়ে যখন বখতিয়ার খিলজী ক্ষমতা দখল করেন, তখন নিভে যায় শেষ শিখাটিও। পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। শত বছরের ধুলায় হারিয়ে যায় আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়।

সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ মিটার উঁচু স্তূপটি দেখতে পাহাড়ের মতো। তাই স্থানীয় মানুষ স্থানটির নাম দেয় পাহাড়পুর।





প্রচলিত ছিল_ এটি কোনো রাজার প্রাসাদ। ১৮৭৯ সালে ইংরেজ প্রত্নতাত্তি্বক স্যার কানিংহাম আবিষ্কার করেন এটি আসলে কোনো প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ নয়, এটিই একদা প্রাচ্যের জ্ঞানপীঠ সোমপুর মহাবিহার।

আমাদের আদি সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন এই সোমপুর মহাবিহার। নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত এ প্রত্ন নিদর্শনটির দূরত্ব জেলা সদর থেকে ৩৪ কিলোমিটার। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী একটি স্থানের মর্যাদা দেয়। তবে নাম বদলে যায়। রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে 'সোমপুর মহাবিহার' হয়ে যায় পাহাড়পুর বিহার। বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক এই মহাবিহারের নামকরণ সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন না করে আবিষ্কৃত বিহারের নামকরণ করা হয়েছে পাহাড়পুর বিহার। প্রাচীন লিপিতে বিহারের নাম সোমপুর মহাবিহার সুর্নিদিষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও শুধু স্থানের নাম বিবেচনায় পাহাড়পুর বিহার নামকরণ যৌক্তিক নয়। আবেগের বশে এমন নামকরণের ফলে বিশ্বের এই ঐতিহ্যের প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ হারানোর পাশাপাশি স্থানটির মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। তিনি সরকার ও পর্যটন বিভাগের কাছে এ বিহারের ঐতিহ্য রক্ষায় প্রাচীন শিলালিপিতে পাওয়া নামানুযায়ী একে 'সোমপুর মহাবিহার' বলে আখ্যায়িত করা উচিত বলে মন্তব্য করেন।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিকুদ্দৌলা রাবি্ব বলেন, 'সোমপুর মহাবিহার'কে 'পাহাড়পুর' করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য মুছে দিচ্ছি। ফলে, হারাচ্ছে বিশ্ববাসীর আকর্ষণ ও গুরুত্ব। দেশ-বিদেশের ইতিহাসে, সাহিত্যে সোমপুর মহাবিহারের উল্লেখ রয়েছে, পাহাড়পুরের নয়।





বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক এই বিহারে সংস্কার কাজ প্রায় নিয়মিতই চলছে। শুধু নামেই নয়, সংরক্ষণ-সংস্কারের নামে সোমপুর মহাবিহারের আকারেও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। তবে ২০০২ সালে বিহারের মূল মন্দিরের দেয়াল সংস্কার এবং পোড়ামাটির ফলক নতুন করে লাগানো হলে তা নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অনেকেই আপত্তি তুলেছিলেন। বর্তমানে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বিহারের উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজ চলছে। এর আওতায় সোমপুর বিহারে ঢোকার মুখে এন্ট্রি কমপ্লেক্স, টিকিট কাউন্টার, স্যুভেনির শপ, গার্ডরুম, ফুডকোর্ট, টয়লেট, পিকনিক শেড, ডরমিটরি, মসজিদ প্রভৃতি তৈরিসহ একটি পুকুর কাটা হবে। এটি করতে গেলে সোমপুর মহাবিহার এলাকার কোনো ক্ষতি হবার আশঙ্কা রয়েছে কি-না জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, 'পাহাড়পুর বিহার এলাকায় জিও ফিজিক্যাল সার্ভে করেই এই কাজগুলো করা হচ্ছে। কাজেই ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই। তা ছাড়া প্রকল্পের কনসালট্যান্ট ড. নিলান কোরের পরামর্শ মতোই কাজ হচ্ছে।'





আমাদের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে পেশাদার প্রত্নতাত্তি্বক ও সংরক্ষণবিদের অভাবে সোমপুর মহাবিহারের সংরক্ষণ যথাবস্থায় মেরামত প্রত্নতত্ত্বের নীতিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি বলে অনেকেই বলছেন। বিহারের সংরক্ষণ কাজে অনেক অর্থ ব্যয় করা হলেও সার্বিক অবস্থার উন্নতি নয়, অবনতি হয়েছে। স্থানীয় গবেষক অধ্যাপক আতাউল হক সিদ্দিকী বলেন, সিমেন্ট, ইট, নতুন পোড়ামাটির ফলক ইত্যাদি যোগ করার জন্য প্রাচীন এ বৌদ্ধবিহারের আদি রূপ ও বৈশিষ্ট্য অনেকটাই ফিকে রঙ ধারণ করেছে। নতুন এ সংস্কারে সোমপুর মহাবিহারের জন্য নতুন কোনো বিপর্যয় যেন ডেকে না আনে এমনটাই প্রত্যাশা করি। এ বিষয়ে অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম খান বলেন, সবকিছু মিলিয়ে কেবলই মনে হচ্ছে 'সোমপুর মহাবিহার' যেন পাহাড়পুর পর্যটন কেন্দ্রে হারিয়ে যাচ্ছে।





ইতিহাস থেকে জানা যায়, পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল (৭৮১-৮২২ খ্রি.) সিংহাসনে আরোহণ করে দীর্ঘকাল রাজত্ব করেন। তার রাজ্য বাংলা ও বিহার ছাড়িয়ে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের গান্ধার পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। ধর্মপাল ছিলেন নিষ্ঠাবান বৌদ্ধ। তিনিই বিক্রমশীলা ও সোমপুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। সোমপুর বিহারের ভিক্ষুরা নালন্দা, বুদ্ধগয়া প্রভৃতি বৌদ্ধ তীর্থস্থানে অর্থ ও ধন-রত্ন দান করতেন বলে বিভিন্ন লিপিতে উল্লেখ করা আছে, যা দশম-একাদশ শতাব্দীতে সমৃদ্ধিশীল অবস্থার ইঙ্গিত বহন করে।





সোমপুর মহাবিহার আবিষ্কারের পর থেকে কয়েক দফায় এর খনন ও সংস্কার হয়েছে। আর তা থেকে বেরিয়ে এসেছে বৌদ্ধ বিহারটির চতুষ্কোনাকার ভূমি-পরিকল্পনা। উত্তর ও দক্ষিণে ৯২২ ফুট এবং পূর্ব ও পশ্চিমে ৯১৯ ফুট বিস্তৃত এই বিহারের চার পাশে ১৪ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১৩ ফুট প্রস্থের ১৭৭টি কক্ষ আছে। ধারণা করা হয়, কক্ষগুলোতে বৌদ্ধভিক্ষুরা থাকতেন। সীমানা দেয়াল বরাবর ভেতরের দিকে সারিবদ্ধ এসব ছোট ছোট কক্ষ। উত্তর দিকে ৪৫টি কক্ষ এবং অন্য তিন দিকে ৪৪টি করে কক্ষ রয়েছে। কক্ষগুলোর প্রতিটিতে দরজা আছে। অনিন্দ্য নির্মাণশৈলীর সোমপুর বৌদ্ধবিহারের ভেতরের উম্মুক্ত স্থানের কেন্দ্রে রয়েছে কেন্দ্রীয় মন্দির। প্রায় ২৭ বর্গ মিটার জায়গার ওপরে এ মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষের উচ্চতা প্রায় ২১ মিটার। মন্দিরটি ক্রুশাকৃতির এবং তিন ধাপে ক্রমহ্রাসমান ঊর্ধ্বগামী, পিরামিডের মতো। মন্দিরের দেয়ালে রয়েছে পোড়ামাটির নানা রকম ফলকচিত্র। কালের গর্ভে যার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।





সোমপুর বিহারের পূর্ব-দক্ষিণ কোণের দিকে প্রাচীরের বাইরে একটি বাঁধানো ঘাটের অস্তিত্ব রয়েছে। একে সন্ধ্যাবতীর ঘাট বলা হয়। কিংবদন্তি আছে_ মৈদলন রাজার কন্যা সন্ধ্যাবতী এ ঘাটে স্নান করতেন। একদিন তিনি ভেসে যাওয়া একটি জবা ফুলের ঘ্রাণ গ্রহণ করার পর গর্ভবতী হন এবং কুমারী অবস্থায় এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। এই পুত্রসন্তান 'সত্যপীর' নামে পরিচিত। ঘাটের অস্তিত্ব থেকে অনুমান করা যায় যে, বিহারের পাশ দিয়ে নদী প্রবাহিত ছিল। বিহার এলাকা খননের সময় বালুর অস্তিত্ব সেই হারিয়ে যাওয়া নদীরই চিহ্ন বহন করে।





সোমপুর মহাবিহারের ভিত্তি বেদিতে রয়েছে পাথরের তৈরি তেষট্টিটি হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি, যেগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মন্দিরের দেয়াল অলঙ্কৃত করেছে। প্রায় দুই হাজার পোড়ামাটির ফলক আছে। মাটির এসব ফলকে সেকালের লোকায়ত কৃষিজীবনেরই স্পষ্ট ছাপ পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুদৃশ্য মাটির ফলক দিয়ে মন্দিরের গা ছেয়ে দেওয়ার জন্য গ্রাম্য শিল্পীদেরই ডাক পড়েছিল। তারা যে জীবনে অভ্যস্ত, সে জীবনকেই তারা তাল তাল মাটিতে রূপ দিয়েছিলেন। তাই, পৌরাণিক কাহিনী থেকে শুরু করে চারপাশের প্রাণিজগৎ, মানুষের উদয়াস্ত খাটা-খাটুনি, দুঃখ-বেদনা, তামাশা, ফুর্তি, নানা অভ্যাস-সংস্কার, ভিক্ষু-সন্ন্যাসী, দেবদেবী কিছুই বাদ যায়নি।

পাল রাজাদের প্রতিষ্ঠিত এসব বিহার জ্ঞান সাধনা, আরাধনা ও জ্ঞান বিস্তারের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হতো। প্রথমে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আবাসস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরে বিহারগুলো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছিল। আধুনিককালে যাকে বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়। সোমপুর মহাবিহারও ছিল সেই সময়ে বিখ্যাত এক বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য করুন