ওরা দুর্ধর্ষ নারী জঙ্গি

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬     আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬      

আতাউর রহমান

শুরুতে স্বামীদের জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে সমর্থন থাকলেও একপর্যায়ে দুর্ধর্ষ জঙ্গি সংগঠকদের স্ত্রী-সন্তানরাও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে ঝুঁকে পড়ে। শুধু তাই নয়_ গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, নব্য জেএমবির নারী শাখাও রয়েছে। নারী জঙ্গিরা অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণও নিয়েছে, বিস্ফোরকদ্রব্য ব্যবহারেও এরা পারদর্শী। পলাতক এক জঙ্গির স্ত্রী ফেরদৌসী আফরিন ওরফে শারমিন ওই দলের মূল সমন্বয়ক।

গোয়েন্দাদের কাছে থাকা তথ্যানুযায়ী, নব্য জেএমবির নারী শাখার সদস্যসংখ্যা খুব বেশি না হলেও তারা ভয়ঙ্কর। অস্ত্র চালানোর পাশাপাশি তাদের বড় প্রশিক্ষণ_ তারা আত্মঘাতী দলের সদস্য। আজিমপুরের আস্তানা থেকে আহত অবস্থায় আটক তিন নারীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, মূলত নব্য জেএমবির পুরুষ সদস্যদের

মধ্যে যারা বিবাহিত তাদের স্ত্রীদের মাধ্যমেই নিষিদ্ধ সংগঠনটির নারী শাখা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এ দলের মূল সমন্বয়কের ভূমিকায় রয়েছে পলাতক জঙ্গি বাশারুজ্জামান ওরফে আবুল বাশার ওরফে শাকিব ওরফে চকলেটের স্ত্রী ফেরদৌসী আফরিন। তবে সংগঠনে তার নাম শারমিন। নারী সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে জঙ্গি প্রশিক্ষক নিহত মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার ইসলাম রয়েছে। এ ছাড়া আজিমপুরের আস্তানায় আত্মঘাতে মারা যাওয়া তানভীর কাদেরীর স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ও পলাতক জঙ্গি মারজানের স্ত্রী প্রিয়তি জঙ্গিদের স্ত্রী ও তাদের নারী স্বজনদের সমন্বয় করছিল। সংগঠনে প্রিয়তির নাম শায়লা আফরিন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার আজিমপুরের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ওই তিন নারীকে আহত অবস্থায় আটক করা সম্ভব হয়েছে। এতে আপাতত নারী জঙ্গিদের নেটওয়ার্কটি দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে গোয়েন্দাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

আটকের পর ওই তিন নারীকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন_ এমন এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিদের নারী শাখার সিদ্ধান্তগুলো অনেক কঠোর। একেক জঙ্গি তাদের স্ত্রীদের দীক্ষা দিয়ে বলেছে, 'জিহাদে'র জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কোনোভাবেই পুলিশের কাছে ধরা পড়া যাবে না। লড়াই করে ধরা পড়ে যাওয়ার আগে প্রয়োজনে আত্মাহুতি দিতে হবে। এরই অংশ হিসেবে আজিমপুরের অভিযানের সময় এক নারী জঙ্গি ক্ষুদ্রাস্ত্র চালাতে চালাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় পুলিশ তাকে ধরতে সমর্থ হয়। আজিমপুরের রাস্তায় ওই নারীর দুর্ধর্ষতা দেখেছে সেখানকার মানুষ। অপর দুই নারী আস্তানা থেকে বের হতে না পেরে সেখানেই আত্মাহুতি দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।

আজিমপুরের ঘটনায় দায়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সহকারী পুলিশ কমিশনার আহসানুল হক জানান, নারী জঙ্গি আবেদাতুল ফাতেমার ছেলে তাহরীম কাদেরী রাসেলকে তিন দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে নারী জঙ্গি ফেরদৌসী আফরিন, আবেদাতুল ফাতেমা, শায়লা আফরিনকে পুলিশ হেফাজতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তারা সুস্থ হলে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে রিমান্ড আবেদন করা হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, আজিমপুরের আস্তানা থেকে গুলি করে পালানোর চেষ্টা করা নারীই নব্য জেএমবির নারী শাখার মূল সমন্বয়ক ফেরদৌসী আফরিন। সংগঠনের স্বার্থেই তার বেঁচে থাকা বা পুলিশের হাত থেকে পালানো জরুরি ছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে। এ জন্য আস্তানার ভেতর ১০ মাস বয়সী মেয়েকে রেখেই সে পালানোর চেষ্টা করে। ফেরদৌসী ইডেন মহিলা কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করেছে। ওই সময়েই জঙ্গি বাশারুজ্জামানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নিজেদের ইচ্ছাতে বিয়ে করলেও পরে পরিবারের সদস্যরা তা মেনে নেন। একপর্যায়ে দু'জনের জঙ্গিবাদে জড়ানোর কথা পরিবারের সদস্যরা জানার পর ফেরদৌসীকে তার বাবা বাসায় নিয়ে যান। তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে সে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর সঙ্গে পালিয়ে যায়। এর পরই ফেরদৌসীর বাবা ঘটনাটি জানিয়ে রাজধানীর কলাবাগান থানায় জিডি করেছিলেন।

কলাবাগানের দ্বিতীয় লেনে ফেরদৌসীর বাবা-মা থাকেন। তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ফেরদৌসীর স্বামী বাশারুজ্জামান সফটওয়্যার প্রকৌশলী। এ জন্যই পরিবারটি তার সঙ্গে বিয়েতে রাজি হয়। তারা জানতেন, বিয়ের পর জামাই-মেয়ে আমেরিকাতে রয়েছে। আমেরিকার কথা বলে তাদের কাছে মাঝে মধ্যে ফোনও দেওয়া হতো। ফেরদৌসীকে ধরা গেলেও তার স্বামীকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।