ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

লেখালেখির জগতে প্রশাসনের তরুণ কর্মকর্তারা

লেখালেখির জগতে প্রশাসনের তরুণ কর্মকর্তারা

মোস্তাফিজার রহমান, ইমতিয়াজ মাহমুদ, মালেক মুস্তাকিম, জাকির জাফরান, রাজীব উল আহসান ও শুভাশিস ঘোষ।

বাহরাম খান

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৩:৫৮ | আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৪:৫৯

প্রশাসন ক্যাডারের তরুণ কর্মকর্তাদের চাকরির শুরুতেই মাঠ প্রশাসনে কাজ করতে হয়। মাঠ প্রশাসন মানেই হচ্ছে দিন-রাত পরিশ্রম করেও কাজ শেষ না হওয়া। এমন অবস্থাতেও কিছু কর্মকর্তা নিজের সৃজনশীল গুণ জাগিয়ে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। যারা ছাত্রজীবন থেকে লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা শত ব্যস্ততার মধ্যেও লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান প্রশাসনের অনেক তরুণ কর্মকর্তা চাকরির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লেখালেখির জগতেও নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখছেন।

প্রশাসনের তরুণ লেখকদের অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তারা জানান, সরকারি চাকরি করে লেখালেখি করার দুই দিকই আছে। ভালো দিক হচ্ছে, মাস শেষে ভাবনাহীন আয়। ফলে সাহিত্যের সঙ্গে অর্থচিন্তা করতে হয় না। কিন্তু অকপট লেখালেখি অনেক সময় চাকরি হারাবার আশংকা তৈরি করতে পারে। এমন অনেক উদাহরণ আছে। যারা রাজনৈতিক বিষয় এড়িয়ে চলেন তাদের তেমন সমস্যার কারণ নেই। এ কারণে সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় গল্প-কবিতা-উপন্যাসই হয় সম্বল। অবসরে যাওয়ার পর রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখলেও সমস্যা থাকে না।

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা ইমতিয়াজ মাহমুদ বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষার অন্যতম শক্তিমান ও জনপ্রিয় কবি। কাজ করছেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবাংলায়ও তিনি সমান জনপ্রিয় কবি। কবিতায় তার ভাবনা, ভাষা, উপমা, ব্যতিক্রমী প্রকাশভঙ্গী তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। 

ইমতিয়াজ মাহমুদের জন্ম ১৯৮০ সালে ঝালকাঠি জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ পড়েছেন। কর্মজীবনের শুরুতে গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন। এএফপির বাংলাবিভাগে সহসম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তার ‘পেন্টাকল’ গ্রন্থের জন্য কলকাতা থেকে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার। 

ইমতিয়াজ মাহমুদের প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ২০০০ সালে, ‌‘অন্ধকারের রোদ্দুরে’ নামে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৮টি। ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতার বইগুলো হলো- অন্ধকারের রোদ্দুরে (২০০০), মৃত্যুর জন্মদাতা (২০০২), সার্কাসের সঙ (২০০৮), মানুষ দেখতে কেমন (২০১০), নদীর চোখে পানিও অন্যান্য কোয়াটরেন (২০১৩), পেন্টাকল (২০১৫), ম্যাক্সিম (২০১৬), কালো কৌতুক (২০১৬), গন্ধমফুল (২০১৯)।

কবি, গল্পকার মোস্তাফিজার রহমান তাঁর আধুনিক ভাবনার সাহসী চর্চা করে যাচ্ছেন লেখালেখির মাধ্যমে। প্রশাসনের ২৫তম ব্যাচের এ কর্মকর্তা বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলার জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন। জীবন, প্রকৃতি ও সমকাল নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন। গদ্যকাব্যের এক নতুন ধারায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের জীবনগাঁথা তার লেখায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। তিনি লিখেছেন সাতটি কাব্যগ্রন্থ ও একটি গল্পগ্রন্থ। কাব্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- আকাশটাকে বেচে দেবো নামমাত্র দামে, অয়নাংশ, গ্রীবাতলে সূর্যালোক, চিলেঘুড়ির অষ্টপ্রহর, দুয়ারে উদ্বাস্তু ঘাতক, তিতির শালিকের অরণ্যবিহার, আমার কোনো বক্তব্য নেই। তার একমাত্র গল্পগ্রন্থ- জলপরির জলছবি। 

মোস্তাফিজার রহমানের কাব্যের ক্যানভাস চরম বাস্তবতার কথা তুলে ধরে। তিনি এই সময়ের সচেতন নাগরিক কবি। মানুষ, প্রকৃতি, চলমান জীবন ফুটে ওঠে তার কলমে।

প্রশাসনের ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা উপসচিব জাকির জাফরান। সুনামগঞ্জ ডিসি অফিসে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। তরুণ কবি হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে চলেছেন। নিজেকে আলাদা করে চেনাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কবিতায় মগ্ন আপাদমস্তক একজন মানুষ। তার জন্ম ১৯৭৬ সালে, সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমায়। পড়ালেখা করেছেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে।

জাকির জাফরানের বইয়ের মধ্যে আছে- সমুদ্রপৃষ্ঠা (২০০৭), নদী এক জন্মান্ধ আয়না (২০১৪), অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী (২০১৫)। অন্ধের জানালা (২০২০), জ্যোৎস্না সম্প্রদায় (২০২১)। কবিতার জন্য তিনি পেয়েছেন ‘বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার’ ও ‘কবিতা আশ্রম পুরস্কার’।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে চট্টগ্রাম জেলায় দায়িত্বপালন করছেন তরুণ কবি মালেক মুস্তাকিম। তিনি প্রশাসনের ৩০তম ব্যাচের  কর্মকর্তা। সরকারি  কর্মকর্তার গণ্ডি পেরিয়ে তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল কবি হিসেবে নিজেকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টায় রত আছেন। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। কবিতায় ভিন্নমাত্রার শব্দচয়ন, ভাষা ও ভাবনার ব্যতিক্রমী প্রক্ষেপণ, নতুন কাব্যভাষা নির্মাণ ও চিত্রব্যঞ্জনায় তাকে সহজেই আলাদা করা যায়। 

মালেক মুস্তাকিমের জন্ম ১৯৮৫ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায়। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই সাহিত্যপত্রিকা ও ছোটকাগজে লেখালেখি ও সম্পাদনায় জড়িয়ে পড়েন।

মালেক মুস্তাকিমের প্রকাশিত কবিতার বই ৬টি। ভুলের ভূগোল (২০১২), বিষণ্নতাবিরোধী চুম্বনগুলি (২০১৬), তোমার সাথে হাঁটে আমার ছায়া (২০১৮), ঘুণপোকা মন (২০২০), একান্ত পাপগুচ্ছ (২০২১), আমি হাঁটতে গেলে পথ জড়িয়ে যায় পায়ে (২০২২)।

প্রশাসনের ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা রাজীব উল আহসানের এ পর্যন্ত তিনটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘একটি নীল লিটমাসের গল্প’ লেখকের প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। এছাড়া ‘দুহিতার বেসাতি’ ও ‘প্রযত্নে অপরাজিতা’ নামে আরও দুটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘একদা হিমু হতে চেয়েছিলাম’ তার একমাত্র উপন্যাস। রাজীব উল আহসান বর্তমানে দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। 

একই ব্যাচের আরেক কর্মকর্তা শুভাশিস ঘোষের বইয়ের মধ্যে রয়েছে- ‘ভাগশেষ শূন্য’ এবং ‘এ কেমন হোলি খেলা’। শুভাশিস বর্তমানে কুমিল্লা দক্ষিণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে কর্মরত।

এছাড়াও প্রশাসন সার্ভিসের অনেক কর্মকর্তাই নিজ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লেখালেখির মতো সৃজনশীল কাজ করছেন। অনেকেই লেখা দিয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বিসিএস প্রশাসন সার্ভিসের তরুণ লেখক কর্মকর্তাদের মধ্যে মিহির মুসাকি, মোহাম্মদ আবদুল লতিফ, আউয়াল আহমদ, তামিম ইয়ামিন, সহস্র সুমন, মনদিপ ঘরাই অনেকেই লেখালেখির মাধ্যমে খ্যাতি ও পরিচিতি অর্জন করেছেন।

আরও পড়ুন

×