বইমেলা

একুশে বইমেলা

মেলা ছুঁয়ে যাবে বসন্ত

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

রোববারই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ভেসে এসেছিল কোকিলের ডাক। গতকাল মঙ্গলবার মধ্যবিকেলে শোনা গেল আবারও। তবে অমর একুশে গ্রন্থমেলার তথ্য জানানোর শব্দযন্ত্রের কাছে তা হারিয়ে গেছে। এ সবই জানান দিচ্ছে- 'বসন্ত এসে গেছে...।' আজ বুধবার রুক্ষ-শুস্ক ঋতু শীতকে বিদায় করে হাজির হচ্ছে ঋতুরাজ বসন্ত। আর সে বসন্তের 'মাতাল সমীরণ' মুখর করছে অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে। আজ পহেলা ফাল্কগ্দুন তো বটেই, আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভালোবাসা দিবসেও নামবে পাঠকের ঢল- এমনটাই মনে করছেন প্রকাশকরা। তারা এ দু'দিন ঘিরে এরই মধ্যে প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছেন। তারা বললেন, দু'দিনেই প্রচুর পাঠক আসেন মেলায়। তাদের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। তার সঙ্গে বিক্রিও মন্দ হয় না। সব মিলিয়ে ফাগুনের ছোঁয়া লাগার প্রত্যাশায় গতকাল মঙ্গলবার নিজেদের প্যাভিলিয়ন-স্টলের ঝাঁপি বন্ধ করেছেন প্রকাশকরা।

আজ ফাগুনের প্রথম দিন হলেও গ্রন্থমেলায় এর প্রভাব পড়েছিল কয়েক দিন ধরেই। গতকাল মঙ্গলবার এ ছোঁয়া নজরে আসার মতো। নিয়ম অনুযায়ী গতকাল মেলার দ্বার খোলে বিকেল ৩টায়। এর পর থেকে মেলায় আসতে থাকা বইপ্রেমীদের অনেকেরই বসনে ছিল বাসন্তী রঙের ছোঁয়া।

গতকাল মেলায় বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে এসেছিলেন আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা সুহানা আফরিন। তার সঙ্গী হিসেবে আসা খালিদ আনোয়ারের পরনে ছিল ভালোবাসার রঙ লাল পাঞ্জাবি। ফাল্কগ্দুন আর ভালোবাসাকে একাকার করে মেলায় ঘুরছিলেন তারা। সুহানা বললেন, 'মেলা ঘুরে দেখছি। পছন্দ হলে বই কিনব। বসন্তের প্রথম দিন ও ভালোবাসা দিবসের দিনও আসার ইচ্ছা আছে মেলায়।'

কলাবাগান থেকে বাসন্তী রঙের সালোয়ার-কামিজ পরে এসেছিলেন জান্নাত আরা। তিনি বললেন, "এবারের মেলায় আজই প্রথম এলাম। এসেই কিনে ফেলেছি চারটি বই- বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রকাশিত হোমারের 'ওডিসি' ও 'ইলিয়ট', অন্যপ্রকাশ থেকে

হুমায়ূন আহমেদের কিশোরসমগ্র এবং ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে খসরু পারভেজের 'মুখোমুখি সুলতান'। ইচ্ছা আছে, আগামী দিনগুলোয় আবারও মেলায় এসে পছন্দের বইগুলো কেনার।"

বসন্তের আগেই বসন্ত ছুঁয়ে যাওয়ার এমন অনেক গল্প ছিল গতকালকের মেলায়। যা দেখে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে পার্ল পাবলিকেশন্সের স্বত্বাধিকারী হাসান জায়েদী বললেন, 'মানুষের উৎসবে যোগ দেওয়ার জায়গা এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সে জন্য বইয়ের এ উৎসবে তারা প্রতিদিনই যোগ দিতে আসছেন। পহেলা ফাল্কগ্দুন ও ভালোবাসা দিবসের দিন সে জন্যই প্রচুর মানুষের সমাগম হবে। বিক্রির চিন্তা সেভাবে মাথায় না থাকলেও এ দু'দিন বিক্রিও মন্দ হবে না।'

লেখক বলছি... মঞ্চ :অন্যান্য দিনের মতো গতকালও মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে লেখক বলছি... মঞ্চে পাঠকের মুখোমুখি হয়েছিলেন পাঁচ লেখক। এর মধ্যে কবি আখতারুজ্জামান আজাদ তার কাব্যগ্রন্থ 'এই যে আমায় আগুন দেয়' (বাংলার প্রকাশনী), কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল উপন্যাস 'লুইপার কালোসাপ' (বিদ্যাপ্রকাশ), প্রাবন্ধিক বেগম আকতার কামাল 'রবীন্দ্র কবিতার বাতায়ন' (কথাপ্রকাশ), কথাসাহিত্যিক হামিম কামাল 'সোনাইলের বনে' (কাগজ প্রকাশন) এবং কবি নাসরিন সিমি 'মৃত নদীতে বিষণ্ণ রাজহাঁস' নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হন।

নতুন বই :গতকাল বিকেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান রচিত 'উত্তরগণতন্ত্র ও লিংকনের পিপল' গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে। চিত্রশিল্পী নাজমা আক্তার প্রধান অতিথি হিসেবে গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন। এ সময় জবির শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. দীপিকা রানী সরকার উপস্থিত ছিলেন। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে মেরিটি ফেয়ার।

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলার ১২তম দিনে নতুন ১৪৯টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গল্প ২৭, উপন্যাস ২৫, প্রবন্ধ ৬, কবিতা ৪৪, গবেষণা ২, ছড়া ৪, শিশুসাহিত্য ১, জীবনী ৪, মুক্তিযুদ্ধ ৪, বিজ্ঞান ৬, ভ্রমণ ৫, ইতিহাস ১, রাজনীতি ৪, স্বাস্থ্য ১, অনুবাদ ১, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ১ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর ১৩টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শাহাবুদ্দিন আহমেদের 'আমার মুক্তিযুদ্ধ' (অন্যপ্রকাশ), অনু হোসেনের সম্পাদনায় 'সমকালে রবীন্দ্রনাথ' (বাতিঘর), ধ্রুব এষের 'কু ঝিক ঝিক' (পাঞ্জেরী), আবুল আহসান চৌধুরীর 'লালনের ঈশ্বর ও অন্যান্য' (জার্নিম্যান), সৈয়দ শামসুল হকের 'পীরচাঁনের পালা' (চারুলিপি), মোস্তফা মামুনের 'লেবাননী জাদুকর' (পার্ল পাবলিকেশন্স), রেজাউর রহমানের 'অচেনা আবাস' (ঐতিহ্য), মারুফুল ইসলামের 'সাতজনের সংসার' (চন্দ্রাবতী একাডেমি) ও মাহবুব ময়ূখ রিশাদের 'তর্কশয্যায় মৃত্যু' (অনিন্দ্য)।

মেলামঞ্চের আয়োজন :গতকাল বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় 'কবি-অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ :জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হাসান হাফিজ। আলোচনায় অংশ নেন শফিউল আলম, রেজাউদ্দিন স্টালিন ও মোহাম্মদ আবদুল হাই। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ।

সন্ধ্যায় কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি জাহিদুল হক ও জাহিদ হায়দার। আবৃত্তি পরিবেশন করেন নাজমুল আহসান ও জিনিয়া ফেরদৌস। সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী কল্যাণী ঘোষ, বিশ্বজিৎ রায়, ফারহানা ফেরদৌসী তানিয়া, সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা, রাজিয়া সুলতানা, নাজমুল আহসান তুহিন, উম্মে রুমা ট্রফি ও সঞ্জয় কুমার দাস।

আজকের আয়োজন :আজ মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে 'কবি রফিক আজাদ :শ্রদ্ধাঞ্জলি' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বিশ্বজিৎ ঘোষ। আলোচনায় অংশ নেবেন অসীম সাহা, ফারুক মাহমুদ ও জাফর আহমদ রাশেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন রশীদ হায়দার। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ, কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।