ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করেই প্রতি বছর আয়োজন করা হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। তবে সেই চেতনা লেখক-গবেষকদের নতুন বই লেখার ক্ষেত্রে আজও কতখানি অনুপ্রাণিত করছে, সেই বাস্তবতা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন অনেক সচেতন পাঠক।
অমর একুশের স্মৃতিবাহী দিনটিতে গতকাল বৃহস্পতিবার মেলা চষে বেড়িয়েও ভাষা আন্দোলন নিয়ে ৫০টি বইয়েরও খোঁজ মিলল না। এ নিয়ে লিখতে যেন বিরাট কার্পণ্য। যে কয়েকটি বই চোখে পড়ল, তার বেশিরভাগ পুরোনো লেখকদের। ভাষা আন্দোলন নিয়ে নতুন লেখকদের আগ্রহ কমই দেখা যাচ্ছে।
প্রকাশকদের মতে, ভাষা আন্দোলন বিষয়ে পাণ্ডুলিপি পাওয়াই যায় না। মাসব্যাপী গ্রন্থমেলার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো অমর একুশেকে স্মরণ। সে কারণে অন্য বইয়ের ভিড়ে ভাষা আন্দোলনের বই রাখতে তারাও আগ্রহী। তবে নতুন লেখকদের মাঝে এ ধরনের লেখালেখির আগ্রহ কম। অবশ্য ভাষাসংগ্রামীদের কেউ কেউ এ বিষয়ে অবিরত লিখে চলেছেন।
গতকাল পর্যন্ত মেলার ১৯ দিনে দুই হাজার ৮৮১টি নতুন বইয়ের নাম গেছে বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে। এর মধ্যে প্রচুর কবিতাগ্রন্থ রয়েছে। আছে গল্পগ্রন্থ এবং উপন্যাসও। মুক্তিযুদ্ধ, অনুবাদ, প্রবন্ধগ্রন্থের পাশাপাশি এবার আলোচনায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা নানা গ্রন্থ। তবে ভাষা আন্দোলন নিয়ে খুব সামান্যসংখ্যক গ্রন্থই চোখে পড়ল।
বইমেলা ঘুরে দেখা গেছে, নতুন বইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বীরত্বের কথা উঠে আসছে নানাভাবে। ভাষা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটেও উঠে এসেছে স্বাধীনতার স্থপতির অবদানের কথা। ভাষা আন্দোলনের ওপর চৌধুরী আনোয়ার রচিত 'ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব' বইটি প্রকাশ করেছে ম্যাগনাম ওপাস।
মেলায় বিভিন্ন প্রকাশনীর প্যাভিলিয়ন ও স্টল ঘুরে ভাষা আন্দোলন বিষয়ে প্রকাশিত কয়েকটি নতুন গ্রন্থ দেখা যায়। আগামী প্রকাশনী এনেছে ড. এম আবদুল আলীমের 'ভাষাসংগ্রামী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌', ড. সালিম সাবরিনের 'ভাষা সাম্রাজ্যবাদ ও মানবাধিকার'; কথাপ্রকাশ এনেছে ড. এম আবদুল আলীমের 'ভাষা-আন্দোলন-কোষ' এবং 'ভাষাসংগ্রামী এম এ ওয়াদুদ'; আলোঘর প্রকাশনা আহমদ রফিকের 'বিচিত্র একুশে বিচিত্র তার চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য'; অনন্যা থেকে সাহিদা বেগমের 'ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও দলিলপত্র', হারুনুর রশিদ ভুঁইয়ার কাব্যগ্রন্থ 'অমর একুশের কবিতা'; নালন্দা থেকে সোহেল মল্লিক সম্পাদিত 'ভাষা আন্দোলনের নির্বাচিত ৫০ কিশোর গল্প'; সাহস পাবলিকেশন্স প্রকাশ করেছে শহিদুজ্জামানের 'সমাজ ভাষাবিজ্ঞান'; ড. আনু মাহমুদের 'ভাষা আন্দোলনের ইতিকথা' এনেছে আলেয়া বুক ডিপো।
ময়ূরপঙ্খি থেকে রফিকুল ইসলামের 'আমার ভাষা'; বিশ্বসাহিত্য ভবনে প্রকাশ হয়েছে সাংবাদিক তারিকুল ইসলাম মাসুমের বই 'একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২'; শিরীন পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে মোহাম্মদ শওকত হোসেনের কাব্যগ্রন্থ কবিতা 'একুশে দেখেছি'; উৎস প্রকাশনী বের করেছে 'ভাষা আন্দোলনে হবিগঞ্জ'; বিজয় প্রকাশ এনেছে আশরাফুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ 'একুশে প্রভাত'; বর্ণক প্রকাশনী থেকে রীনা আহমেদের গল্পগ্রন্থ 'বাংলার প্রহরী ২১ ফেব্রুয়ারি'; রিয়া প্রকাশনী এনেছে মাইনুল ইসলাম মাস্টারের প্রবন্ধগ্রন্থ 'একুশের অবদান'। এছাড়া গতকাল প্রকাশিত অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- বুলবুল চৌধুরীর 'প্রাচীন গীতিকার গল্প' (পার্ল পাবলিকেশন্স), আফসান চৌধুরীর '১৯৭১ :গণনির্যাতন-গণহত্যা কাঠামো, বিবরণ ও পরিসর' (কথাপ্রকাশ), মাহবুব আজীজের 'লুব্ধক' (পাঠক সমাবেশ), ওবায়েদ আকাশের 'পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর' (অরিত্র প্রকাশনী)।
আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গনি সমকালকে বলেন, ভাষা আন্দোলন নিয়ে পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় না। নতুন লেখকেরা গল্প-উপন্যাস, কবিতাগ্রন্থ এমনকি সায়েন্স ফিকশনও লেখেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলন নিয়ে এক ধরনের অনাগ্রহ দেখা যায়। অবশ্য ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার মতো যথেষ্ট মেধা ও যোগ্যতার বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে হয়তো অনেকে বিষয়টি নিয়ে ভাবেন না। তবে বইমেলা যেহেতু একুশের চেতনায়, সেহেতু অন্য সব বইয়ের মাঝে ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক বইকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে।
মঞ্চের আয়োজন :বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আবুল কাসেম রচিত 'বঙ্গবন্ধু ও চাশিল্প' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দীপংকর মোহান্ত। আলোচনায় অংশ নেন মেসবাহ কামাল ও মোকারম হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ।
প্রাবন্ধিক বলেন, জাতীয়তাবাদী ও জনমুক্তির নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অন্তরের গহীনে অবহেলিত চা শ্রমিকদের দীর্ঘশ্বাসের স্পন্দন প্রতিধ্বনি হতে শোনা যায় নানাভাবে। ১৯৫৬ সালে চা শ্রমিকদের হাত ধরে তিনি প্রথম বলেছিলেন, 'তোমাদের সকল দুঃখের খবরই রাখি। এসব দুঃখ দূর করবার জন্য আমরা খুবই চেষ্টা করিব'। আবার বঙ্গবন্ধু পূর্ববঙ্গের শিল্পোন্নয়নে উদার নীতিমালার অংশ হিসেবে চাশিল্প ও ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে অল্প সময়ে ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। তার অবদান যথাযথ মূল্যায়িত হয়েছে গবেষক আবুল কাসেমের বঙ্গবন্ধু ও চাশিল্প গ্রন্থে।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন মাসুদুজ্জামান, রঞ্জনা বিশ্বাস, মাজুল হাসান এবং মঈনুল হাসান। ছড়াপাঠের আসরে ছড়া পাঠ করেন ছড়াকার আখতার হুসেন, ফারুক নওয়াজ, সুজন বড়ূয়া, খালেক বিন-জয়েনউদ্দিন, মাহমুদউল্লাহ এবং সৈয়দ আল ফারুক।
হুইলচেয়ার হস্তান্তর :অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শারীরিক সমস্যাগ্রস্ত মানুষের সহজে প্রবেশের সুবিধার্থে বেক্সিমকো ফার্মার পক্ষ থেকে ১৫টি হুইলচেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে। দুপুরে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কাছে হুইলচেয়ারগুলো হস্তান্তর করেন ডা. মোহাইমিনুল ইসলাম কৌশিক। এ সময় অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এর সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ এবং গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সুভাষ সিংহ রায় উপস্থিত ছিলেন।
আজকের আয়োজন :আজ অমর একুশে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৭টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। সভাপতিত্ব করবেন কবি রুবী রহমান। বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হবে অমর একুশে বক্তৃতা। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ও সাম্প্রতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গ শীর্ষক একুশে বক্তৃতা প্রদান করবেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
আজ মেলার দুয়ার খুলবে সকাল ৮টায়। চলবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। ছুটির দিন হিসেবে যথারীতি সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুপ্রহর। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।