আহমদ রফিকের নতুন বইয়ের খোঁজ করতেই বিক্রয়কর্মী এগিয়ে দিলেন শুক্রবার মেলায় আসা আধুনিকতা ও বাংলাদেশের কবিতাগ্রন্থটি। মলাট খুলে সূচির পৃষ্ঠায় একপলক তাকালেন পাঠক। সাত-পাঁচ না ভেবে দাম পরিশোধ করে বই নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। এ সময় কথা হয় তার সঙ্গে। পঞ্চাশোর্ধ্ব শহীদুল ইসলামের হাতে তখনও ঝুলছিল লেখকের তালিকাটি। আহমদ রফিকের বই দিয়ে কেনা শুরু। কাঙ্ক্ষিত সব বই কেনা শেষ হলে তবেই ফিরবেন।

তার মতো অনেকেরই গতকাল শনিবার বইমেলায় ব্যস্ত সময় কেটেছে। বেছে বেছে বই কিনছেন তারা। মেলায় এদিন এত ভিড় ছিল যে কারও সঙ্গে কথা বলার ফুরসত মিলছিল না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় সব প্যাভিলিয়ন ও স্টলেই ছিল বিপুল পাঠক সমাবেশ। ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস। প্রতিদিনের মতোই আনন্দ উদযাপনে কেটেছে মেলার ২১তম দিনটি।

গতকাল মায়াবী বিকেলে অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য ছিল 'লেখক বলছি' মঞ্চ ঘিরে। তন্ময় হয়ে লেখকের কথা শোনার মতো এত শ্রোতার দেখা মিলল যেন বহুকাল পরে। ওই সময়ে বাস্তববাদী লেখক আহমাদ মোস্তফা কামালের কথা শুনছিলেন শ্রোতারা। এমনকি সন্ধ্যা নেমে এলেও মঞ্চের সামনের মাঠটি ছাড়েননি পাঠক-শ্রোতা। এদিন মঞ্চে আরও কথা বলেন সলিমুল্লাহ খান, সাখাওয়াত টিপু ও চঞ্চল আশরাফ। রাত ৮টা পর্যন্ত পাঠকের নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েই যাচ্ছিলেন লেখকেরা।

পাশেই স্বাধীনতা স্তম্ভ ঘিরে একটুখানি জিরিয়ে নেওয়া কিংবা বিকেলের সৌন্দর্য উপভোগের চিত্রও ছিল অন্যদিনের মতোই। কেউ কেউ লেকের পানিতে পা দুটো আলতো ভিজিয়ে নিচ্ছিলেন। গ্রন্থ উন্মোচন মঞ্চেও ছিল প্রাণবন্ত উপস্থিতি। লিটল ম্যাগ থেকে শিশুচত্বর, সবখানেই পূর্ণতা। মেলার শেষ দিকের চেনা দৃশ্যই।

নির্ধারিত গণ্ডিগুলোর কথা বাদ দিলে বাকি সবটাই বই কেনাবেচার গল্প। বাংলা একাডেমিতে খুব বেশি স্টল নেই। সে হিসাবে বই বেচাকেনার খণ্ড খণ্ড গল্প কেবলই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।

মূলত একুশে ফেব্রুয়ারি থেকেই তুঙ্গে ওঠে বইয়ের বিক্রিবাট্টা। এদিন নিরাশ হতে হয়নি কাউকেই। টিএসসিসংলগ্ন প্রবেশপথ দিয়ে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকলে যে কয়েকটি প্যাভিলিয়ন দু'দিন আগেও অলস সময় কেটেছে বিক্রয়কর্মীদের, শুক্রবার থেকে বদলে যায় সেই দৃশ্যপটও।

গতকাল সরকারি ছুটির দিন মেলার দুয়ার খোলে সকাল ১১টায়। প্রথম দুই ঘণ্টা ছিল শিশুপ্রহর। এ সময় শিশুদের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে মেলাপ্রাঙ্গণ। বিকেল থেকে পুরোপুরি জমে ওঠে মেলা। বাড়ে বেচাকেনাও। বিভিন্ন প্যাভিলিয়ন ও স্টলের সামনে ছোট ছোট জটলা দেখা যায়। সব জটলার মধ্যমণি হয়ে ছিলেন লেখক-লেখিকারা। বই কিনে লেখকের অটোগ্রাফ ও ফটোগ্রাফের সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি বেশিরভাগ পাঠক। লেখকদের ঘিরে এই আড্ডা মেলাকে করে তোলে আরও আনন্দময়, আরও প্রাণবন্ত।

এবার ছিমছাম মেলার বিস্তৃত পরিসর নিয়ে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছে মুখে মুখে। অন্য বছরের মতো শুরু থেকে ধুলাবালির মুখে পড়তে হয়নি দর্শনার্থীদের। তবে শুক্রবার থেকে বিপুল উপস্থিতির কারণে বড় রকম দুর্ভোগের বিষয় ছিল ধুলোবালি।

গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ২৪২টি। এর মধ্যে হাসনাত আবদুল হাইয়ের 'মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র' (আগামী), ফরিদুর রেজা সাগরের 'বল্টু ভুতের গল্প' (ইতি প্রকাশ), মোহিত কামালের 'হ্যাঁ' (বিদ্যাপ্রকাশ), আহমাদ মোস্তফা কামালের 'পাখির চোখে দেখা' (সন্দেশ), মজিদ মাহমুদের 'সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা' (কথাপ্রকাশ), আনোয়ার কবিরের 'বঙ্গবন্ধু :শত ফুলের কোরাস' (প্রকৃতি), মোস্তফা সেলিমের 'সিলেটি নাগরীলিপি সাহিত্যে প্রণয়োপাখ্যান' (অনিন্দ্যপ্রকাশ), রওশান আরা সিদ্দিকীর 'বুকের ভিতর নদী' (উৎস) ইত্যাদি। এ নিয়ে মেলার ২১ দিনে তিন হাজার ৬৩১টি নতুন বই প্রকাশের তথ্য রয়েছে বাংলা একাডেমিতে। একক বিষয় হিসেবে কাব্যগ্রন্থ হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল পর্যন্ত কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে এক হাজার ১৩৬টি।

শিশু-কিশোরদের পুরস্কার প্রদান : সকাল ১১টায় অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশু-কিশোরদের পুরস্কার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর এমপি। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির সচিব (ভারপ্রাপ্ত) অপরেশ কুমার ব্যানার্জি, অমর একুশে গ্রন্থমেলার সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদসহ সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, প্রতিটি শিশুর ভেতরেই সৃষ্টিশীল প্রতিভা লুকিয়ে আছে। অভিভাবকদের দায়িত্ব হবে শিশুর এই প্রতিভা বিকাশের জন্য সুন্দর ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, সন্তানদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে পারলে তারা ভবিষ্যতে সুনাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

মঞ্চের আয়োজন: বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত 'বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ :বহুমাত্রিক বিশ্নেষণ' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ পাঠ করেন মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নেন ড. সোনিয়া নিশাত আমিন, গোলাম কুদ্দুছ ও মামুন সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মুহাম্মদ সামাদ।

কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি অসীম সাহা, মুহাম্মদ সামাদ, মাশুক চৌধুরী, ফরিদ কবির, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, পিয়াস মজিদ ও আলতাফ শাহনেওয়াজ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল মো. আনোয়ার হোসেনের পরিচালনায় 'আরশিনগর বাউল সংঘ' শিল্পীদের পরিবেশনা।