সকালে মেঘে ঢাকা আকাশ। দুপুরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। ভিজে যায় সবুজ ঘাস, পিচঢালা পথ। ঘড়ির কাঁটা ৩টা ছুঁতেই খুলে যায় বইমেলার সব দুয়ার। শুরু হয় পাঠকের আনাগোনা। কারও মাথায় রং-বেরঙের ছাতা, কেউ ফুলের টায়রা মাথায় লাগিয়েই বৃষ্টিবিলাসী হয়ে ওঠার চেষ্টায়। মাত্র এক মিলিমিটার বৃষ্টিতে কিছুই ভেসে যায়নি। তবে নানা আঙ্গিকে সাজানো স্টল-প্যাভিলিয়নের চারপাশে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ত্রিপল। অল্প সময়ের জন্য বই চলে যায় পাঠক-চক্ষুর আড়ালে। অবশ্য দর্শনার্থীদের আনন্দ উদযাপনে ভাটা পড়েনি সামান্যতমও। সন্ধ্যা নামার আগেই পাঠকের জোয়ার শুরু হয়। তাতে সবকিছুকে করে দেয় স্বচ্ছ-সতেজ।
বইমেলার বিদায়ী বিকেলগুলো ঘিরে পাঠক-দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড় কিংবা বিকিকিনিতে ঘাম ঝরানোর যে সম্ভাব্য চিত্রপট আঁকা হয়ে থাকে, গতকাল মঙ্গলবার ঠিক তেমনটি দেখা যায়নি। তবে স্মরণকালের বৃহৎ পরিসরের মেলাপ্রাঙ্গণে গতকাল পাঠকের সংখ্যাই বেশি ছিল। বৃষ্টি থামার পরে উত্তরের হিমেল হাওয়া স্বাধীনতা স্তম্ভের সামনের লেক ছুঁয়ে পরশ দিয়ে যাচ্ছিল সবাইকে।
সন্ধ্যার পরে স্টল থেকে স্টলে ছুটে চলা বেশিরভাগ দর্শনার্থীর হাতে দেখা যায় বইয়ের থলে। ছিল শিশুদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিও। ঘাসের ওপর বৃত্তাকার আড্ডার দৃশ্যপট বদলে গিয়ে এ দিন খণ্ড খণ্ড মিলন মেলা দেখা যায় লিটল ম্যাগ চত্বর, শিশু চত্বর, বঙ্গবন্ধু পাঠ, গ্রন্থ উন্মোচন মঞ্চের সামনে আর উন্মুক্ত উদ্যানজুড়ে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে দেখা যায়, সন্ধ্যার পর বইয়ের বিকিকিনি জমে ওঠে। বিভিন্ন প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মীরা জানান, শুরু থেকে মেলায় বিপুল দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছে। প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক উপস্থিতি। তবে প্রতিদিন দর্শনার্থীর তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম ছিল। গতকাল কিছুটা বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে দৃশ্যপট উল্টে যায়। অন্যদিনের তুলনায় উপস্থিতি কম ছিল। তবে বিক্রয়কর্মীদের মতে, 'দর্শকের চেয়ে ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে।'
বৃষ্টি শেষের মায়াবী বিকেলে কবি, লেখক, কথাসাহিত্যিক, চিত্রশিল্পীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে বাংলাপ্রকাশের প্যাভিলিয়ন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই প্যাভিলিয়নে গতকাল পাঠ-উন্মোচন হয় তিথি আফরোজের ইংরেজি কবিতাগ্রন্থ 'দ্য ব্লাইন্ড গড'।
এই পাঠ উন্মোচন করেন কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা, সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও কবি মুস্তাফিজ শফি, চিত্রশিল্পী ও কথাশিল্পী সৈয়দ ইকবাল ও কথাসাহিত্যিক মাহবুব আজীজ। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন গ্রন্থের অনুবাদক কামরুল হাসান, লেখক হাসান গোর্কি, বাংলাপ্রকাশের সৈয়দ মাহফুজ আল হোসাইন, লেখক বেলায়েত হোসেন, ছড়াকার রহীম শাহ প্রমুখ।
সন্ধ্যায় আগামী প্রকাশনীতে গিয়ে দেখা যায়, লেখক আবু হেনা মোরশেদ জামানকে ঘিরে পাঠকদের উচ্ছ্বাস। বইমেলায় এসেছে তার লেখা রম্য রচনার বই 'আমার বন্ধু জ্ঞানী তৈল সিং'। বইয়ে অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে পাঠকদের সঙ্গে টুকটাক আলাপ করছিলেন তিনি। লেখক বলেন, বীরবল, গোপাল ভাঁড় কিংবা মোল্লা নাসির উদ্দিনের আদলে বইটি লেখা হয়েছে। তবে তার চরিত্রটি ইতিহাসের কোনো কিংবদন্তি চরিত্র নয়। তিনি সমাজের সমসাময়িক ঘটনাবলি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
এদিকে, সন্ধ্যায় মেলায় আসেন ছাত্রলীগ সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে তারা বইমেলায় ঘুরে বেড়ান।
হিম হিম পরিবেশে সন্ধ্যায় কবিতা, কথা আর গল্পে মুখর হয়ে ওঠে লেখক বলছি মঞ্চ। এখানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন সালমা বাণী, রফিকুর রশীদ, সাদ কামালী এবং নওশাদ জামিল। প্রতিদিনের মতো কালও পাঠকের প্রাণবন্ত উপস্থিতি ছিল এখানে।
২৪তম দিনে নতুন বই এসেছে ৯১টি। এর মধ্য দিয়ে নতুন প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চার হাজার অতিক্রম করল। গতকাল পর্যন্ত চার হাজার ৮৩টি বইয়ের নাম জমা পড়েছে বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে। এর মধ্যে শুধু কবিতাগ্রন্থ রয়েছে এক হাজার ২৯৭টি। গল্পগ্রন্থ এবং উপন্যাস মিলিয়ে হাজার ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুবিষয়ক, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক, প্রবন্ধ, সায়েন্স ফিকশন, গোয়েন্দা, শিশুতোষ, ছড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ের বই প্রকাশ হচ্ছে। পাঠকের আগ্রহে বিভিন্ন লেখকের পুরোনো বইগুলোও ছিল।
গতকাল অন্বেষা প্রকাশনী এনেছে ডা. আবু সাঈদ শিমুলের স্বাস্থ্যবিষয়ক বই 'শিশুর নৈতিকতা ও সুস্বাস্থ্যের সহজ উপায়'। গল্পের ছলে শিশুদের সামাজিক আচরণ ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ার নানা উপায় তুলে ধরেছেন তিনি। শিশুরা বড়দের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, লাইনে দাঁড়ানো, অযথা চেচামেচি না করা, সহনশীল হওয়া, হিংসা-লোভ থেকে দূরে থাকা, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, হাঁচি-কাশির নিয়ম, হাত ধোয়া, দুর্ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসা, রাস্তা পারাপারের নিয়মসহ অনেক কিছুই এতে আছে। এছাড়া মেলায় আসা নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে- রফিকুল ইসলামের 'মুক্তিযুদ্ধ-সমগ্র' (আগামী), ইকবাল হাসানের কবিতা 'নিবেদিত পংক্তিমালা' (রয়্যাল পাবলিশার্স), মুস্তাফিজ শফির কিশোর উপন্যাস 'ধানসিঁড়ি হোস্টেলে বিভীষিকার কয়েক রাত' (আলোঘর), সুভাষ সিংহ রায়ের 'দ্য অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার শেখ হাসিনা ইন ইউনাইটেড নেশন' (অনন্যা), মোকারম হোসেনের 'ভালো রাখি পরিবেশ' (মিজান পাবলিশার্স), সুমন কুমার দাশের 'লোকগানের বিচিত্র ধারা' (কথাপ্রকাশ), আলমগীর শাহরিয়ারের 'নিদাঘ দিনের গান' (চৈতন্য)।
মঞ্চের আয়োজন :বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় সমীর কুমার বিশ্বাস রচিত 'বঙ্গবন্ধুর সমবায়-ভাবনা' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ পাঠ করেন সেলিম জাহান। আলোচনায় অংশ নেন রাজু আলাউদ্দিন, তপন বাগচী এবং এ এফ এম হায়াতুল্লাহ। লেখকের বক্তব্য দেন সমীর কুমার বিশ্বাস। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী।
কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি সিদ্ধার্থ হক, মিলু শামস, আফরোজা সোমা, মন্দিরা এষ এবং গিরীশ গৈরিক। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল মীর জাহিদুল হাসানের পরিচালনায় এবং মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের পরিবেশনায় নাটক 'মহাপ্রয়াণের শোক আখ্যান'।
এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ বুধবারও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বইমেলামুখী পাঠক-দর্শনার্থীদের বিষয়টি মাথায় রেখেই মেলায় আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিষয় : অমর একুশে গ্রন্থমেলা

মন্তব্য করুন