আগা সাদেক সড়কে বাংলাদেশ মাঠের উত্তর-পূর্ব কোণে ভিড়। দোয়েল চত্বর যাওয়ার বাহন খুঁজে ফিরছেন, পাচ্ছেন না। এই রুটে একমাত্র বাহন রিকশা। যাত্রীশূন্য একটিও নেই। সবই দোয়েল চত্বরমুখী। গতকাল শুক্রবার দিনভর রিকশা, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন বাহনের প্রধান গন্তব্য ছিল দোয়েল চত্বর ও টিএসসি মোড়। সব পথ বর্ণিল হয়ে ওঠে উৎসবে। আর সব দিকের ভিড়ই ছিল বইমেলামুখী।
মেলায় ঢুকে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে যেতে কয়েক তরুণী বলাবলি করছিলেন, 'এবার মেলা নাকি অনেক বড়সড় পরিসর নিয়ে হয়েছে। কই আর বড়, এত ভিড়!' তাদের কণ্ঠে অনেকটা বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ। বিরক্ত হবেনই না কেন! স্মরণকালের বড় পরিসরের মেলাও যেন গতকাল ছোট্ট হয়ে এসেছিল।
দুই প্রাঙ্গণের প্রতিটি প্রান্তে গতকাল বসেছিল প্রাণের মেলা। এসেছিলেন লেখকরা, তাদের ঘিরে ছিল অটোগ্রাফের জন্য পাঠকের দীর্ঘ সারি আর হৈচৈ। বই কেনার জন্য ধাক্কাধাক্কি, ভিড় ঠেলে কাঙ্ক্ষিত বইটি পেয়ে বিশ্বজয়ের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার খণ্ড খণ্ড দৃশ্য যেন গল্পের মতো। বই, লেখক, সর্বোপরি বইমেলা ঘিরে মানুষের এই প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাসে শেষটা যেন অনেক আশাই জাগিয়ে যাওয়ার।
এবার এক দিন পরে শুরু হয়েছিল প্রাণের মেলা। তবে অধিবর্ষের সুবাদে ফেব্রুয়ারির বয়স যখন এক দিন বেশি, হিসাব তো একই হয়ে গেল। শেষের দু'দিনে সময় যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুতই। গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ- সর্বত্রই যেন বিদায়ের বিষাদ, সঙ্গে বই বেচাকেনার তোড়জোড়। কথা আর সুরে, স্টল কিংবা প্যাভিলিয়নে- দিকে দিকে বিদায়ের ধ্বনি। অতুলকৃষ্ণ মিত্রের কালজয়ী শ্যামাসংগীতের কথাগুলোই কাল অনুরণিত হচ্ছিল মেলাজুড়ে। বই কেনার সাধ কারও মিটেছে, কারও মেটেনি; তবে বেলা যে ফুরায়ে এলো, এ কথায় ভুল নেই।
'জ্ঞানার্জন, ধনার্জনের চেয়ে মহত্তর'- বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর এই কথার হিসাব মেলানোর দিন এসে গেল অবশেষে। অবশ্য দিনের হিসাব শেষ। আজ বিদায়ী ক্ষণের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তের দূরত্ব কমছে ঘণ্টার
কাঁটায় কিংবা মিনিটে। নিশ্চিতভাবে আজ সবকিছু চলবে হিসাব করে, মেপে মেপে। বিদায়ী ক্ষণ এসে গেল বলে।
গতকাল বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আগামী প্রকাশনীতে
দেখা যায় অটোগ্রাফ দিচ্ছেন বিদেশি লেখক স্টিফানো রোমানো। তার লেখা আলোকচিত্রবিষয়ক গ্রন্থ 'সুইট লাইট' প্রকাশ হয়েছে এখানে। অন্যপ্রকাশের চারপাশে রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি। কথাপ্রকাশ ঘিরেও বিপুল পাঠক সমাবেশ। প্রথমায় পাঠকদের অটোগ্রাফ দিয়ে দিন পার করেন আনিসুল হক। অন্যধারায় পাঠক কিনেছেন লাইন ধরে সাদাত হোসাইনের বই। উৎস, অন্বেষা, পার্ল, অনিন্দ্যপ্রকাশ, বাংলাপ্রকাশ, তাম্রলিপি, পাঠক সমাবেশ, ইত্যাদি, মিজান পাবলিশার্স, সময় প্রকাশনী, মাওলা ব্রাদার্স, চারুলিপি, অনন্যা, নালন্দা থেকে শুরু করে প্রায় সব প্যাভিলিয়ন ও স্টলে গতকাল অভাবনীয় পাঠক সমাগম দেখা গেছে।
বাংলা একাডেমির বিক্রয়কর্মীরা জানান, শেষ সময়েও সমানে বিক্রি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তৃতীয় গ্রন্থ 'আমার দেখা নয়াচীন'। পুরো মাস ধরে এটিই বাংলা একাডেমির সর্বাধিক বিক্রীত গ্রন্থ।
এদিকে, শেষ পর্যায়েও নতুন বই প্রকাশ থেমে নেই। গতকাল নতুন বই এসেছে ৩৪১টি। এ নিয়ে ২৭ দিনে নতুন বইয়ের সংখ্যা চার হাজার ৭৩৫টি। গতকাল গ্রন্থিক থেকে প্রকাশ হয়েছে কাওসারী জাহান নিম্মির কাব্যগ্রন্থ 'নির্ঘুম রাত'। মিজান পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত আবুল বাশারের গল্পগ্রন্থ 'স্বপ্ন স্বপ্নান্তর'-এর পাঠ-উন্মোচন করেন কবি-লেখকেরা। শিক্ষক, সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হকের গবেষণামূলক তিনটি গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। 'মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র : অবিনাশী দলিল' ও 'আলোকচিত্রের ভাষা ও পাঠ' সংকলন ও সম্পাদিত দুটি গ্রন্থ। অপর গ্রন্থ 'বাংলাদেশের তাঁতশিল্প ও মুক্তবাজার অর্থনীতি'। প্রথম দুটি বই প্রকাশ করেছে বাংলানামা ও তৃতীয় বইটি প্রকাশ করেছে বিশ্বসাহিত্য ভবন। এছাড়া গতকাল মেলায় আসা বইয়ের মধ্যে সেলিনা হোসেনের 'স্মরণে শেখ মুজিব' (আগামী), আতিউর রহমানের 'বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ :নাই নাই ভয় হবে হবে জয়' (পাঞ্জেরী), সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের 'অলস দিনের হাওয়া' (অরিত্রী প্রকাশনী), নূহ-উল-আলম লেলিনের 'সময়ের ভাবনা : দর্শন-ভাবাদর্শ-রাজনীতি' (সময়), স্বকৃত নোমানের 'শেষ জাহাজের আদমেরা' (পাঞ্জেরী), ড. মো. নজরুল ইসলামের 'ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও মর্যাদা' (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়), ইলিয়াস হোসেনের 'আবিস্কারের মজার কথা' (টুনটুনি প্রকাশন), কামরুন নাহার কুহেলীর 'ঘুলঘুলির আলোয় আঁকা পথ' (পুন্ড্রবর্ধন) উল্লেখযোগ্য।
বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গিত এবারের মেলার আজ শনিবার বিদায়ের দিন। মেলার দুয়ার খুলবে সকাল ১১টায়। রাতেই থেমে যাবে প্রাণের সুর। ছুটির দিন বলে আজও বিপুল পাঠক সমাবেশ এবং বিক্রি ভালো হওয়ার প্রত্যাশা প্রকাশকদের। মেলার সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব মেলানোরও দিন আজ। তবে পাঠকের দিক থেকে ব্যর্থতার গল্প নেই বললেই চলে। মাসজুড়ে মেলায় তারাই গড়েছেন ছোট ছোট সব আনন্দের গল্প।
মঞ্চের আয়োজন : বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় আবুল কাসেম রচিত 'বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক উন্নয়নদর্শন :জাতীয়করণ নীতি এবং প্রথম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ পাঠ করেন অসীম সাহা। আলোচনায় অংশ নেন কাজী রোজী, এম এম আকাশ এবং নাসিমা আনিস। লেখকের বক্তব্য দেন আবুল কাসেম। সভাপতিত্ব করেন আতিউর রহমান।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কামরুল হাসান, জাহীদ রেজা নূর, অদিতি ফাল্কগ্দুনী এবং মাসুদ পথিক।
কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি রুবী রহমান, কামাল চৌধুরী, নূহ-উল-আলম লেনিন এবং হারিসুল হক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী ফরিদা পারভীন, সাইদুর রহমান বয়াতি, লীনা তাপসী খান, অদিতি মহসিন এবং সেলিম চৌধুরী। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (তবলা), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি), দৌলতুর রহমান (কী-বোর্ড), এস এম রেজা বাবু (বাংলা ঢোল) এবং শেখ জালালউদ্দিন (দোতরা)।
বিদায়ী অনুষ্ঠান : আজ সন্ধ্যায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি সচিব ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এনডিসি। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেবেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। গ্রন্থমেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০'-এর সদস্য-সচিব ড. জালাল আহমেদ।
রাত ৮টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অমর একুশে গ্রন্থমেলার সমাপনী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করবেন রূপা চক্রবর্তী ও হাসান আরিফ। সংগীত পরিবেশন করবেন শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও খায়রুল আনাম শাকিল। সবশেষে রয়েছে লেজার শো।

বিষয় : অমর একুশে গ্রন্থমেলা

মন্তব্য করুন