সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ধুলা উড়ছে। ঘাসগুলো আধশুকিয়ে দেখাচ্ছে সবুজ আর খড়-রঙা। গতকাল বৃহস্পতিবার উদ্যানের ঘাসগুলো একটু জিরিয়ে নেওয়ার সময় পেয়েছে। প্রথম দিনে এমনিতে লোকজন মেলায় কম আসে। তার ওপর ছিল কর্মব্যস্ত দিন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোকসমাগম বাড়লেও জমজমাট বলতে যা বোঝায়, তেমন কোনো আভাস পাওয়া যায়নি প্রথম দিন। বেশিরভাগ স্টলের কাজ শেষ হয়ে এলেও অনেক স্টলে এখনও রং করা বাকি।

বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম দিন গতকাল মেলায় এসেছেন বরিশালের নাজমুল ইসলাম। তিনি আট বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা। প্রথমবার দেশে এসেছেন। উঠেছেন ঢাকার শেওড়াপাড়ায় পরিবারের সঙ্গে। মেলায় প্রথম দিনেই কিছু বই কিনেছেন। হাতে বেশ কয়েকটি বইয়ের ব্যাগ। কী বই কিনেছেন, জিজ্ঞেস করতেই মুচকি হেসে বলেন, 'ছফাসমগ্র, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বইসহ কয়েকজন লেখকের বই। এখনও নতুন বই আসা শুরু হয়নি। কাল-পরশু আবার আসব। দেখি, কিছু কেনা যায় কিনা। ভিড় বাড়ার আগেই কেনাকাটা শেষ করে ফেলতে চাই।' মেলার এই বৃহৎ পরিসর কেমন লাগছে, জিজ্ঞেস করলে বলেন, 'এখন অনেক বেশি প্রকাশনী যোগ হয়েছে। আগে এত ছিল না। ভালোই লাগছে।'

গতকাল মেলায় বইয়ের ক্রেতাসংখ্যা ছিল কম। যারা এসেছেন, ঘুরেফিরে দেখেছেন। তবে প্রথম দিনের হিসাবে বই যে একেবারে কম বিক্রি হয়েছে, তাও না। অনেককেই দেখা গেছে বিভিন্ন প্রকাশনীর বইয়ের ব্যাগ হাতে। বেশ কয়েকটি বিক্রয়কেন্দ্রের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিক্রি খুব বেশি না হলেও প্রথম দিনের হিসাবে ঠিক আছে।

অন্যপ্রকাশ প্রকাশনীর কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম তদারক করছিলেন স্টলের সাজসজ্জার। পাশে দাঁড়িয়ে গল্পে গল্পে জানা হলো প্রকাশকদের মেলা নিয়ে চিন্তার ব্যাপারে। তিনি বলেন, 'প্রতি বছর বইমেলা ফেব্রুয়ারিতে হয়ে আসছে। এবার মহামারি করোনা সব ওলটপালট করে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত মার্চে মেলার আয়োজন করা হলো। নতুন বই আসতে শুরু করেছে। মেলায় প্রথম দিনের উপস্থিতি খুব বেশি না হলেও আমরা আশাবাদী। কাল (আজ শুক্রবার) ছুটির দিনে ভিড় আরও বাড়বে।' করোনার কারণে বইয়ের সংখ্যা কমবে না বলে ধারণা তার। তিনি বলেন, 'গত বছরের বইমেলাতে আমরা ৬০টি বই করেছিলাম। এবার করছি প্রায় একশটি।'

কয়েকজন প্রকাশক অবশ্য মহামারির কারণে বইমেলার ব্যাপ্তি কমা নিয়ে চিন্তায় আছেন। তাদের যুক্তি, মার্কেট-শপিং মল খোলা থাকলে বইমেলা কেন বন্ধ করা লাগবে? করোনা কি শুধু বইমেলা থেকেই ছড়াবে? তবে তারা স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বইমেলা পরিচালনার কথাও বলেন।

মেলার কোথায়, কী আছে: বাংলা একাডেমির এবারের বইমেলায় ঢোকা ও বের হওয়ার গেট তিনটি। প্রতিটি গেটে বাংলা একাডেমির ভলান্টিয়াররা দর্শনার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছেন। এ ছাড়াও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা থাকছে। পাশাপাশি গেটের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বইয়ের প্যাভিলিয়ন এবং তথ্যকেন্দ্র। ঝড়-বৃষ্টিতে আশ্রয় নিতে সব গেটে ঢোকার মুখে থাকছে সাইক্লোন শেল্টার। টিএসসির উল্টোপাশ দিয়ে ঢুকলে দু'পাশেই সারি করে বানানো স্টলগুলো চোখে পড়ে।

এবার প্রথমবারের মতো রমনা উদ্যানের দিক থেকে নতুন আরেকটি গেট রাখা হয়েছে। এই গেটের পাশেই রাখা হয়েছে পার্কিংয়ের জায়গা। এই গেট দিয়ে ঢুকে বেশ খানিকটা জায়গা পেরিয়ে চেকিং-এর ব্যবস্থা হয়েছে।

মেলায় নতুন বই: বইমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা 'আমার দেখা নয়াচীন'-এর ইংরেজি অনুবাদ 'নিউ চায়না'র মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেলার প্রথম দিন থেকেই বইটি পাওয়া যাচ্ছে বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়নগুলোতে। বইটি অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক ফকরুল আলম।

মেলার প্রথম দিনে বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগ থেকে নতুন বই প্রকাশের কোনো তথ্য না পেলেও বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি প্রকাশনী নতুন বই আসার খবর দিয়েছে। এর মধ্যে অবসর এনেছে হায়াৎ মামুদের গল্পগ্রন্থ 'যাদুকরের ভেঁপু', গোলাম মুরশিদের 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃৃতিক পটভূমি'; টাঙ্গন এনেছে অ্যাডভোকেট জাকিয়া তাবাসসুম জুঁইয়ের 'মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য দলিল'; অন্যপ্রকাশ এনেছে হারুন হাবীবের 'কলকাতা ৭১', হারুন-অর-রশীদের 'ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা'; ইউপিএল এনেছে জগলুল আলমের অনুবাদে মওদুদ আহমদের 'সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার' ইত্যাদি।

আজকের অনুষ্ঠান: আজ শুক্রবার দ্বিতীয় দিন বইমেলা শুরু হবে বেলা ১১টায়। চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেলে বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে 'স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী :বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান হবে। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সুভাষ সিংহ রায়। আলোচনায় অংশ নেবেন সংসদ সদস্য আরোমা দত্ত ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।