বিকেল ৩টা। বইমেলার গেট খুলে দিলে স্বাধীনতা স্তম্ভের সামনের ছোট জলাধার থেকে ভিজে আসা বাতাস শরীর জুড়িয়ে দেয়। শুরুতে খুব বেশি দর্শনার্থী ছিলেন না গতকাল রোববার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। যারা এসেছিলেন, তাদের বেশিরভাগই বসেছিলেন জলাধারের পাশের ফাঁকা বেঞ্চে। তাদের মধ্যে ঝলক গোপ পুলক মেলায় ঘুরতে এসেছেন হবিগঞ্জ থেকে। মেলায় এসেছেন বন্ধুদের সঙ্গে। এবারের মেলার ডিজাইন নিয়ে বেশ খুশি তিনি। তার কারণও আছে। গত বছর যেখানে আট লাখ বর্গফুট জায়গায় স্টল করা হয়েছিল, এবার সেখানে নেওয়া হয়েছে ১৫ লাখ বর্গফুট। তাই স্টলের দুই সারির মাঝখানের জায়গা প্রশস্ত যথেষ্ট। এ কারণে এবার মেলার চতুর্থ দিনে প্রচুর দর্শনার্থী থাকলেও খুব একটা ভিড় মনেই হচ্ছে না।

তবে প্রতিবারই মেলার স্টলের অবস্থান নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। এবারও উঠেছে। মেলায় স্টল পাওয়া অনেক প্রকাশকই স্টল ও প্যাভিলিয়নের অবস্থান নিয়ে অভিযোগ করছেন। তাদের মতে, এবারের মেলার ডিজাইনে স্টলগুলোকে একপাশে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্যাভিলিয়নগুলো রয়েছে সুবিধাজনক অবস্থানে। তাই ছোট প্রকাশনার স্টলগুলোয় সমাগম কম। বিক্রির অবস্থাও তথৈবচ। তবে প্যাভিলিয়ন-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, প্রিয় লেখকদের বইয়ের সন্ধানে পাঠকরাই তাদের বিক্রয়কেন্দ্রে ভিড় জমাচ্ছেন।

তবে স্টলের অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে জোরদার অভিযোগ উঠেছে লিটলম্যাগ চত্বর থেকে। এবার লিটলম্যাগ চত্বর রাখা হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের গেটের দিকে। জায়গাটি যেন একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কবি শাহেদ কায়েসও বলছিলেন এমন কথা। তার মতে, 'বর্তমানের পাঠকপ্রিয় অনেক কবি-সাহিত্যিক লিটলম্যাগ চত্বর থেকে উঠে এসেছেন। এটিকে একপাশে রেখে দেওয়া কারোরই ভালো লাগেনি।' অবশ্য অধিকাংশ লিটলম্যাগ স্টল মালিকের দাবির কারণে টনক নড়েছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের। চত্বরটি গতকাল রোববারই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত চত্বরের পাশে সরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কবি ওবায়েদ আকাশ বললেন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের গেট নতুন হওয়ায় এদিকটায় মানুষের চলাচল কম। তাই লিটলম্যাগ চত্বরে এ ক'দিন কেউই তেমন আসেনি। সবাই মনে করছেন, এবারের মেলায় লিটলম্যাগ চত্বর নেই। তাই আগের স্থানে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ এ দাবি মেনে নিয়েছে। গতকাল রোববার ছুটির দিন না হলেও শেষ বিকেলে প্রচুর দর্শনার্থী মেলায় এসেছেন। বইয়ের বিক্রিও বেড়েছে। বই কেনা ছাড়াও অনেকে ব্যস্ত ছিলেন ছবি তোলায়। দর্শনার্থীদের দু'দণ্ড শান্তি দিতে গতকাল প্যাভিলিয়নগুলোর মাঝখানে নতুন করে কিছু বাঁশের বেঞ্চ বানানো হয়েছে। আরও কয়েকটির কাজ চলছে। অনেকেই সেগুলোতে বসে মন ভরে আড্ডা দিয়েছেন।

গতকাল বিকেলে উদ্যানের মেলা চত্বর পরিদর্শন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এ সময় তিনি মেলার ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, 'বইমেলা আমার সবসময় ভালো লাগে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিদেশ থেকেও অনেক অতিথি দেশে আসছেন। তাদের মধ্যে অনেক লেখক-গবেষকও আছেন। বড় সব অতিথি হয়তো সময়ের অভাবে এখানে আসতে পারবেন না। তবে তাদের সঙ্গে যে ডেলিগেটস আসছেন, তাদের আমরা বইমেলায় আসতে উৎসাহিত করব।'

প্রেস ক্লাব ও ডিআরইউর স্টল উদ্বোধন: গ্রন্থমেলায় প্রথমবারের মতো স্টল দিয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাব। গতকাল রোববার বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে স্টলের উদ্বোধন করেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, যুগ্ম সম্পাদক আশরাফ আলী, কোষাধ্যক্ষ শাহেদ চৌধুরী, কার্যনির্বাহী সদস্য রেজানুর রহমান, কাজী রওনাক হোসেন, শাহনাজ বেগম পলি, রহমান মুস্তাফিজ, শাহনাজ পারভীন প্রমুখ। অতিথিরা তথ্য প্রতিমন্ত্রীর হাতে 'রক্তে গাঁথা বর্ণমালা' বই উপহার হিসেবে তুলে দেন। রেজোয়ানুল হকের সম্পাদনায় বইটি প্রকাশ করেছে জাতীয় প্রেস ক্লাব।

পরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই ডিআরইউর স্টল উদ্বোধন করেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। এ সময় ডিআরইউ সভাপতি মোরসালিন নোমান, সাধারণ সম্পাদক মসিউর রহমান খানসহ সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

নতুন বই: সন্ধ্যার আগে বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে ৮১টি নতুন বই মেলায় আসার ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব বইয়ের মধ্যে কবিতা ২৩টি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ১৭টি, উপন্যাস ১১টি, গল্প ৮টি, জীবনী ৪টি, শিশুসাহিত্য ৩টি, ইতিহাস, ভ্রমণ এবং চিকিৎসা-স্বাস্থ্যবিষয়ক দুটি করে; প্রবন্ধ, রাজনীতি, বিজ্ঞান ও সায়েন্স ফিকশন একটি করে এবং অন্যান্য বই রয়েছে পাঁচটি। এসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান :জনক আমার, নেতা আমার' (চারুলিপি), আনিসুজ্জামানের 'মহামানবের সাগরতীরে' (প্রথমা), রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের ভূমিকাসংবলিত মুস্তাফিজ শফি সম্পাদিত 'মুজিব কেন জরুরি' (কথাপ্রকাশ), মহিউদ্দিন আহমদের 'লাল সন্ত্রাস' (বাতিঘর), আবু সাঈদ খানের 'ধ্বনি প্রতিধ্বনি সমকালীন সমাজ ও রাজনীতি' (পাঠক সমাবেশ), হাসনাত আবদুল হাইয়ের 'জনকের গল্প' (অন্যপ্রকাশ), হরিশংকর জলদাসের 'যুগল দাসী' (মাওলা), আসিফ নজরুলের 'নিষিদ্ধ কয়েকজন' ও মুনতাসীর মামুনের 'মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন দলিলপত্র' (অনন্যা), গোলাম মুরশিদের 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক পটভূমি' (অবসর), রাশিদা বেগমের 'আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর' (তৃণলতা)। আগামী এনেছে '৫০ প্রেমের কবিতা' শিরোনামে আনোয়ারা সৈয়দ হক ও মহাদেব সাহার পৃথক দুটি বই এবং 'বঙ্গবন্ধু-মুক্তিযুদ্ধ' শিরোনামে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আনিসুজ্জামান, বেলাল চৌধুরী, হাসনাত আবদুল হাই, আনোয়ারা সৈয়দ হক ও পিয়াস মজিদের পৃথক সাতটি বই। অনিন্দ্য এনেছে রুদ্র গোস্বামীর 'যদি ভালোবাসা যেতে বলে'। বইমেলায় এই চার দিনে মোট বই এসেছে ২৪০টি।

আজ লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন মুম রহমান, মন্দিরা এষ এবং বিধান রিবেরু।

মূল মঞ্চের আয়োজন: গতকাল রোববার বইমেলার চতুর্থ দিন বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়েছে 'স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী :স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী। আলোচনায় অংশ নেন কল্যাণী ঘোষ, বুলবুল মহলানবীশ এবং আশরাফুল আলম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রামেন্দু মজুমদার।

আজকের অনুষ্ঠান: আজ সোমবার বইমেলার পঞ্চম দিনে মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে হবে 'স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী :বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন তারেক রেজা। আলোচনায় অংশ নেবেন নাসির আহমেদ, খালেদ হোসাইন ও মিনার মনসুর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কবি অসীম সাহা।

বিষয় : অমর একুশে গ্রন্থমেলা একুশে গ্রন্থমেলা অমর একুশে

মন্তব্য করুন