করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের জারি করা নতুন 'বিধিনিষেধ' কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, প্রথম দফার বিধিনিষেধ যেসব কারণে হোঁচট খেয়েছে সরকার নিশ্চয়ই তা পর্যালোচনা করেছে। সেই আলোকে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এখন এগুলোর কঠোর বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর লকডাউনের বিকল্প নেই।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ে সর্বত্রই উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে হাসপাতালে ভর্তির জন্য আক্রান্ত রোগীদের শয্যা পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়ছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করেও অনেকে শয্যা পাচ্ছেন না। আইসিইউর পাশাপাশি সাধারণ শয্যার জন্যও চলছে হাহাকার। রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ'র কোনো শয্যাই খালি নেই।

রাজধানীর বাইরে সাধারণ শয্যা ফাঁকা থাকলেও আইসিইউ শয্যা মিলছে না। রোগীর এ ধরনের চাপ অব্যাহত থাকলে হাসপাতালে ভর্তির জায়গা দেওয়া সম্ভব হবে না বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ।

করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ৫ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিধিনিষেধ আরোপ করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তাও হোঁচট খেয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়লেও মানুষ কঠোর বিধিনিষেধ মানতে চাইছে না। এ কারণে পরিবহন চালু করার পাশাপাশি দোকানপাট ও শপিংমল খুলে দিতে হয়েছে। আগের বিধিনিষেধ কার্যকর না হওয়ার ঘটনায় সরকারও উদ্বিগ্ন।

এ পরিস্থিতিতেই গতকাল সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে কঠোর লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে অবশ্য লকডাউন কথাটি ব্যবহার না করে বিধিনিষেধ বলা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, আগামীকাল বুধবার সকাল ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। প্রজ্ঞাপনে জরুরি সেবার বাইরে শিল্প-কলকারখানা খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে ওইসব প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব পরিবহনে কর্মীদের আনা-নেওয়া করতে হবে। আগের প্রজ্ঞাপনেও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিজস্ব পরিবহনে আনা-নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তা মানেনি। এতে কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে গণপরিবহন চালু করতে হয়েছে। এরপরই মূলত বিধিনিষেধ অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এবারও একই অবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অনেকে বলেছেন, জরুরি সেবার বাইরে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের নিজস্ব পরিবহনে আনা-নেওয়া না করলে এবারও সরকারি বিধিনিষেধ হোঁচট খেতে পারে। সেক্ষেত্রে করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ কাজে আসবে না। বরং পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। তারা বলেন, এবারের লকডাউন যাতে কোনোভাবেই ঢিলেঢালা না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে নজরদারি বাড়াতে হবে।

অনেকে বলেছেন, শিল্প-কারখানা খোলা রাখার জন্য যেসব শর্তারোপ করা হয়েছে, মালিকরা সেগুলো যথাযথভাবে পালন করছে কিনা তাও নজরদারি করতে হবে। অন্যথায় আগের মতো নতুন বিধিনিষেধও অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।

১০ দিনেই আক্রান্ত ৬৭ হাজারের ওপরে, মৃত্যু ৬৬৭ :করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ৩ এপ্রিল ৫ হাজার ৬৮৩ জন আক্রান্ত এবং ৫৮ জন মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ৪ এপ্রিল ৭ হাজার ৮৭ জন আক্রান্ত ও ৫৩ জনের মৃত্যু, ৫ এপ্রিল ৭ হাজার ৭৫ জন আক্রান্ত ও ৫২ জনের মৃত্যু, ৬ এপ্রিল আক্রান্ত ৭ হাজার ২১৩ জন ও মৃত্যু ৬৬ জনের, ৭ এপ্রিল আক্রান্ত ৭ হাজার ৬২৬ জন ও মৃত্যু ৬৩ জনের, ৮ এপ্রিল আক্রান্ত ৬ হাজার ৮৫৪ জন ও মৃত্যু ৭৪ জনের, ৯ এপ্রিল আক্রান্ত ৭ হাজার ৪৬২ ও মৃত্যুবরণ করেন ৬৩ জন। ১০ এপ্রিল ৫ হাজার ৩৪৩ জন আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণ করেন ৭৭ জন, ১১ এপ্রিল ৫ হাজার ৮১৯ আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণ করেন ৭৮ জন। গতকাল ১২ এপ্রিল আক্রান্ত ৭ হাজার ২০১ এবং মৃত্যুবরণ করেন ৮৩ জন।

সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সর্বশেষ ১০ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৭ হাজার ৩৬৩ জন আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৬৬৭ জন। প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৩৬ জন এবং মৃত্যুবরণ করেন ৬৬ জনের বেশি।

দেশে গত বছরের ৮ মার্চ করোনার সংক্রমণ শনাক্তের পর ওই বছরের জুন-জুলাই মাসে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কিন্তু ওই সময়ের তুলনায় গত ১০ দিনে দ্বিগুণেরও বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হচ্ছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুতে নতুন নতুন রেকর্ড গড়েছে করোনা।

কঠোর হতে বললেন বিশেষজ্ঞরা :করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার আরোপিত বিধিনিষেধের কঠোর বাস্তবায়ন চেয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, সরকার যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, সেটি কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য কঠোর হতে হবে।

তিনি বলেন, দেশে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার গত ৬ এপ্রিল থেকে যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, তা প্রথম দিন থেকেই ঢিলেঢালা ছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা ওই ব্যবস্থাকে 'বিধিনিষেধ' বলা হলেও সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী একে 'লকডাউন' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু শুরু থেকেই কোথাও লকডাউনের লেশমাত্র ছিল না। সরকার কেন বিধিনিষেধগুলো কার্যকর করতে পারল না? কেন পিছু হটল সরকার? এ বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে হবে। আশা করি, এবার আগের মতো হবে না। মানুষকে ঘরে রাখতে না পারলে সংক্রমণ ও মৃত্যু এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যে, তাতে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাও ভেঙে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, কিছু খোলা, আবার কিছু বন্ধ রেখে তো লকডাউন হয় না। লকডাউন হলো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া। অর্থাৎ পরিবারের সদস্যদের বাইরে অন্যদের সঙ্গে কোনো ধরনের দেখা-সাক্ষাৎ হবে না। সবকিছু বন্ধ থাকবে। এ অবস্থা না থাকায় আগের বিধিনিষেধ মানুষ মানেনি। বরং মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। এতে সরকারের পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছে। এবারও শিল্পকলকারখানা খোলা রাখা হলো।

বলা হয়েছে, নিজস্ব পরিবহনে কর্মীদের আনা-নেওয়া করতে হবে। আগের নির্দেশনায়ও একই কথা বলা হয়েছিল। সেটি তো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকরা করেননি। এর প্রেক্ষাপটে গণপরিবহন চালু করতে হলো। আবার শিল্পকলকারখানা চালু থাকায় দোকান ও শপিংমল মালিকরা আন্দোলনে নামেন। পরে তাও খুলে দিতে হয়েছে। এভাবে বিধিনিষেধ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এবার সরকারকে নির্দেশনার কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, সরকারের জারি করা বিধিনিষেধ নিয়ে অনেক সমালোচনা করার সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, এটি বিজ্ঞানসম্মত হয়নি। কারণ সাত দিন ধরে বিধিনিষেধ আরোপ করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কারণ মানুষের শরীরে করোনার সুপ্তিকাল এক থেকে ১৪ দিন। এ সময়ের মধ্যে একজনের শরীরে সংক্রমণ প্রকাশ পাবে। একটি ধাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে নূ্যনতম ১৪ দিন লকডাউন করা প্রয়োজন। দুটি ধাপ নিয়ন্ত্রণে ২৮ দিন লকডাউন করা প্রয়োজন এবং এটিই বিজ্ঞানসম্মত। আর দ্বিতীয়ত, লকডাউন মানে হলো সবকিছু বন্ধ থাকবে। শিল্পকারখানা খোলা রেখে কর্মীদের নিজস্ব পরিবহনে আনা-নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এটির বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তা দেখভাল করবে কে? কিংবা এটি বাস্তবায়িত না হলে সে জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা বলা হয়নি।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আরোপিত বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে মত দেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিধিনিষেধ-সংক্রান্ত যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, তা সরকার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করবে। কারণ সংক্রমণ ও মৃত্যু যে হারে বাড়ছে, তা উদ্বেগের। এ অবস্থা চলতে থাকলে হাসপাতালে রোগী রাখার জায়গা মিলবে না। পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা হুমকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আক্রান্ত ও মৃত্যু আরও বাড়বে। সুতরাং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সবাইকে সরকার আরোপিত বিধিনিষেধ মানতেই হবে। এর বিকল্প নেই।

মন্ত্রী বলেন, মানুষের জীবন বাঁচাতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবে। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নতুন করে আরও প্রায় চার হাজার শয্যা বাড়ানো হচ্ছে। আগে থেকে ১০ হাজারের ওপরে শয্যা ছিল। এর পরও শয্যা বাড়ানো হলে অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের সেবা মিলবে না। সুতরাং বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

মন্তব্য করুন