আদিবাসী শিশুদের কাছে শিক্ষার শুরুটা এখনও ভীতিকর অবস্থার মধ্যেই রয়ে গেছে বলে ‘আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কাপেং ফাউন্ডেশন, যারা আদিবাসীদের মানবাধিকার সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, তাদের উদ্যোগে এ গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক ফারহা তানজীম তিতিল।

বুধবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ওয়াইডব্লিউসিএ মিলনায়তনে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষা নিয়ে কাপেং ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাঠ জরিপের ভিত্তিতে গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এক বছর মেয়াদী প্রকল্পটি পরিচালিত হয়েছে পাত্র, খাসি ও হাজং শিশুদের মধ্যে।

প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তালিকায় ৫০টি জাতির কথা বলা হলেও সরকারি উদ্যোগে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাউপকরণ তৈরি করা হয়েছে। অথচ ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে স্পষ্ট করে ‘আদিবাসী শিশু যেন নিজেদের ভাষা শিখতে পারে, সেই লক্ষ্যে তাদের জন্য আদিবাসী শিক্ষক ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করা’র কথা বলা আছে। সরকার স্বীকৃত তালিকার ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে কমপক্ষে ৩০টি ভাষার প্রচলন রয়েছে। শুরুতে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের তালিকাভুক্ত ছয় জাতির মধ্যে সাঁওতালরা বর্ণমালা বিতর্কে বাদ পড়ে গেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বর্ণমালা থাকা না থাকা প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা-উপকরণের তৈরিতে খুব জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে শিশুদের কাছে বোধগম্য ভাষায় শিক্ষা দানের উদ্যোগ। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং শিক্ষা উপকরণ।

প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, ইতোমধ্যে যে পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা হয়েছে, তারা সংখ্যালঘু জাতিগুলোর মধ্যে সংখ্যা এবং শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে থাকা। অথচ মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার শুরু করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা এবং বিপণ্নদের ভাষাকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করা উচিত। উদাহরণ হিসেবে দিনাজপুরের কড়াদের কথা বলা হয়। তাদের ১০০ মানুষ এবং আনুমানিক ৩০ জন শিশুর জন্য একটি মাত্র স্কুল প্রয়োজন। কডা, পাত্র, খাসিদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য বলে দাবি করা হয়েছে। তবে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের সব জনগোষ্ঠীর নিজ নিজ মায়ের ভাষায় পড়তে শেখার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। ‘মাতৃভাষায় শিক্ষা’ বলতে প্রথমে যার যার মাতৃভাষার মৌখিক ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। অথচ এর বদলে তাদের ভাষার লিখিত রূপ বা নিজস্ব হরফ আছে কিনা, এমন বিভ্রান্তিপ্রসূত গৌণ প্রশ্নের সঙ্গে শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার তাগিদকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে।

গবেষণাদলে গবেষকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন মিতা হাজং ও দীপ্ত চাকমা। প্রতিবেদনের ওপর আলোচনা করেন আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, বাংলাদেশ সরকারের উপসচিব ব্রেঞ্জন চাম্বুগং, লেখক ও সাংবাদিক রাজীব নূর, পাত্র কল্যাণ পরিষদের নির্বাহী পরিচালক গৌরাঙ্গ পাত্র, জাতীয় হাজং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পল্টন হাজং, কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের প্রতিনিধি হেলেনা হিরামন তালাং।

কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন উজ্জ্বল আজিম।