করোনা থাকছে বিশ্বব্যাপী। করোনা থাকছে আমাদের সঙ্গে নতুন নতুন নামে। করোনাভাইরাস দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইউরোপসহ বিশ্বের নানা দেশ আর লকডাউন দিচ্ছে না। মানুষের জীবিকা বন্ধ করে জীবন চলে না- এই বোধ ফিরে এসেছে দেশে দেশে। করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার টিকা নিচ্ছে সারাবিশ্ব। বাংলাদেশ দ্রুত সময়ে জনগণের বড় অংশকে টিকা দিতে সক্ষম হয়েছে, যা এই সরকারের একটি বড় সফলতা। ফলে আমরা মনে করি, এ বছর করোনার মধ্যেও আমাদের প্রিয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা বন্ধ করে রাখার কোনো বাস্তবতা নেই। দেশে চলছে হাটবাজার, সুপার মার্কেট, বাণিজ্য মেলাসহ নানা ধরনের জনসমাবেশ।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন লেখক এবং বইপ্রেমী। গত দুই বছর ধরে করোনা মহামারির কারণে আমাদের প্রকাশনা শিল্প যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত। এই সময়ে স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মূলত কোনো ধরনের বই-ই বিক্রি হয়নি। যে কারণে আজকে বাংলাদেশে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পের নাম প্রকাশনা শিল্প। আমরা মনে করি, এবারের বইমেলা স্বল্প পরিসরে আয়োজন করে ১৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা যায় কিনা, তা তিনি বিবেচনা করবেন। এ বছর করোনা পরিস্থিতি এখনও বিপজ্জনক কোনো পর্যায়ে আসেনি, সে ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ১৫ দিনব্যাপী (৭ থেকে ফেব্রুয়ারি ২১) অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২২ আয়োজনের আহ্বান জানাচ্ছি। করোনার সংক্রমণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২২ সফল করার জন্য আমাদের ১০টি সুপারিশ ও প্রস্তাবনা।

১. স্বাস্থ্যবিধি মেনে 'নো মাস্ক নো এন্ট্রি' ও টিকা সনদ প্রদর্শন করে প্রবেশ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

২. স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োজনে মেলায় একাধিক 'প্রবেশপথ' ও 'বাহির পথ'-এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৩. অমর একুশে বইমেলা ২০২২-এর সময়সূচি করা হোক প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা। ঢাকা শহর ও সারাদেশের মানুষের আগমন ও নির্গমন সুবিধার কথা চিন্তা করে এবং ভিড় এড়িয়ে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বইমেলার সময়সূচি নির্ধারণ করলে একদিকে মানুষের ভিড় এড়ানো সুবিধা হবে, আবার অফিসফেরত মানুষও বইমেলায় যেতে পারবেন।

৪. অমর একুশে বইমেলা ২০২২ সফল করতে বইমেলায় যাওয়া-আসার জন্য মেলা প্রাঙ্গণ ঘিরে ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটে অন্তত ৫০টি বাস চালু করা হোক। বাংলা একাডেমি বিআরটিসি ও সিটি করপোরেশনকে সঙ্গে নিয়ে বইমেলার জন্য অতি সহজেই বাস সার্ভিস চালু করতে পারে। এখানে সদিচ্ছা ও উদ্যোগ নেওয়াটাই প্রধান ব্যাপার। আমরা চাই সবাই নির্বিঘ্নে বইমেলায় আসতে বা বাসায় ফিরতে পারেন এমন বাস সার্ভিস স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরেই চালু হোক।

৫. ১৮ বছরের ঊর্ধ্ব বয়সীদের জন্য মেলায় প্রবেশের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে অনাহূত জনসমাগম এড়ানো যাবে এবং যারা বইপ্রেমী মূলত তারাই বইমেলায় যাবেন ও বই সংগ্রহ করতে পারবেন। ছাত্রছাত্রীরা তাদের আইডি কার্ড দেখিয়ে বিনা টিকিটে মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন।

৬. প্যাভিলিয়ন চতুর্দিকে খোলা না রেখে প্রবেশ-বাহির পথসহ নির্মাণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু জোনে নয়, প্যাভিলিয়নের অবস্থান হতে হবে পুরো মেলার সমানুপাতিক অবস্থানে। (প্রায় ৬০০ স্টলের বিপরীতে মাত্র ২০-২২টি প্রতিষ্ঠানকে প্যাভিলিয়ন নামে বড় অংশ বরাদ্দ দিয়ে পুরো মেলাকে ছন্দহীন করে রাখা হচ্ছে বছরের পর বছর। সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা মনে করি, এই মেলায় প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ বন্ধ রাখা যেতে পারে, যা বইমেলার নির্মল সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনবে।)

৭. মেলায় প্রবেশ ও বাহির পথের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর ও রমনার মোড়ের ট্রাফিক ও পথচারীদের চলাচলের পথ সুগম রাখতে হবে। মেট্রোরেলের নির্মাণ স্থাপনা ও বিভিন্ন রোড ডিভাইডার ইত্যাদি সুশৃঙ্খল করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ দিবস (ভ্যালেন্টাইন ডে, পহেলা ফাল্কগ্দুন, অমর একুশে, শুক্র ও শনিবার) নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। এসব দিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক পাঠক-ক্রেতা মেলায় আসেন। নিরাপত্তা ইস্যুসহ পাঠক, ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের আসা-যাওয়া নির্বিঘ্ন করার পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

৮. খাবারের দোকান বা ক্যান্টিন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না দিয়ে নির্দিষ্ট জোনে দিতে হবে। টিএসসির গেট দিয়ে উদ্যানে প্রবেশের পর এলোপাতাড়ি খাবার ও কাবাব ইত্যাদির দোকান বরাদ্দ বন্ধ করতে হবে।

৯. অমর একুশে বইমেলাকে শিশুবান্ধব করতে হবে। স্টল সজ্জা শিশুদের উপযোগী করতে হবে, তারা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে মেলায় ঘোরাঘুরিসহ স্টলে প্রদর্শিত বই দেখতে পারে।

১০. লেখক, কবি ও সাহিত্যিকদের নিয়ে যে আলোচনা আয়োজন নিয়মিত মেলা প্রাঙ্গণে হয়, এর কলেবর আরও বৃদ্ধি করা হোক।

লেখকবৃন্দ: প্রকাশক, পাঠক ও লেখক