বাকি ছিল মাত্র একটি দিন। কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই গতকাল রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে কাঙ্ক্ষিত সেই ঘোষণাটি এলো। সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ জানালেন, অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২২ এর সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ১৭ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। এ খবরে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন লেখক, প্রকাশক, পাঠক- সবাই। গতকালের মেলা প্রাঙ্গণেও বয়ে গেছে এ খবরে আনন্দের উচ্ছ্বাস।

গতকালের তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'আনন্দের বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে বইমেলা আগামী ১৭ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানোর ব্যাপারে সদয় সম্মতি জানিয়েছেন।'

অবশ্য বইমেলার সময় যে বাড়ছে- বিষয়টি গত কয়েক দিন আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। তার পরও করোনাজনিত পরিস্থিতিকে কর্তৃপক্ষ কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তা নিয়ে সবার মধ্যে মিশ্র ধারণা ছিল। জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সময় বাড়ানোয় উৎফুল্ল সবাই।

অন্বেষা প্রকাশনীর প্রকাশক মো. সাহাদাত হোসেন বললেন, 'সময় বাড়ছে বলে আমরা আশান্বিত। আমরা প্রথম থেকেই সময় বাড়ানোর দাবি করে আসছিলাম। কারণ পাঠকরা প্রথমে ক্যাটালগ সংগ্রহ করেন, পরে বই কেনেন। এখন তারা বই কেনার জন্য আরও সময় পাবেন।'

শোভা প্রকাশের প্রকাশক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, বইমেলার সময় বাড়ানো নিঃসন্দেহে ভালো পদক্ষেপ। নতুন মাসে অনেকেই বেতন পেয়ে বই কিনবেন। বইয়ের প্রসারে প্রকাশকদের বিনা ভাড়ায় স্টল দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

পাণিনি প্রকাশনের প্রকাশক হাসনাথ মোবারক বললেন, সময় বাড়ানোর ফলে আরও নতুন বই বাঁধাই করে নিয়ে আসতে পারব। মেলার সময় বাড়বে না- এ রকম প্রচার থাকায় এবার প্রথমদিকেও পাঠকরা প্রচুর বই কিনেছেন বলে জানান তিনি। সমগ্র প্রকাশনীর প্রকাশক শওকত আলী তারা বলেন, গত বছর স্টল দিয়ে বই এনে বিক্রয়কর্মীদের বেতন দিয়ে সব মিলিয়ে খরচ হয়েছিল লাখের ওপরে। কিন্তু বিক্রি হয়েছিল মাত্র ১২ হাজার টাকা। এ বছর এখন পর্যন্ত মেলায় দর্শনার্থীর উপস্থিতি ভালো। বিক্রিও হচ্ছে বেশ। মেলার সময় বাড়ানোর ফলে আশা করি, গতবারের ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতে পারব।

প্রসঙ্গত, ১৫ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরুর সময় বলা হয়েছিল, মেলা চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে সময় বাড়ানো হবে। গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে করোনার সংক্রমণ কমছে। শনাক্তের হার নেমে এসেছে ৫ শতাংশের নিচে। এমন পরিস্থিতিতে বইমেলার সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

মেলায় ঘুরতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাশেদুল ইসলাম বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পর্যন্ত মেলা চালু থাকবে জেনে খুব ভালো লাগছে।'

ইডেন মহিলা কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী দুই বান্ধবী জান্নাতুল ফেরদৌস ও ফারিয়া ইসলাম এসেছেন বইমেলায়। কোন ধরনের বই কিনেছেন, জানতে চাইলে ফারিয়া বলেন, 'রোমান্টিসিজম, ট্রাভেলিং ও শিশুতোষ বই কিনেছি। হুমায়ূন আহমেদ স্যার আমার পছন্দের লেখক। তার বইও কিনব।'

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব একেএম আব্দুল আওয়াল মজুমদার বলেন, এ পর্যন্ত তার ২০টি বই প্রকাশ হয়েছে। এ বছর চারটি বই এসেছে। মেলার সময় বাড়ানোয় পাঠকরা বই কেনার সময় পেলেন।

হুমায়ুন আজাদকে স্মরণ: বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর মৌলবাদী চক্রের সন্ত্রাসী হামলার বার্ষিকী ছিল গতকাল। এ উপলক্ষে গতকাল বিকেল ৫টায় লেখক-পাঠক-প্রকাশকরা যুক্তভাবে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের তথ্যকেন্দ্রের সামনে তাকে স্মরণ করেন। এক মিনিটের নীরবতা পালনের পর আয়োজিত সভায় বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, হালিমদাদ খান, মোহন রায়হান, আসলাম সানী, প্রকাশক হুমায়ুন কবীর, শায়লা রহমান তিথি, ড. জালাল আহমেদ, হুমায়ুন আজাদের মেয়ে মৌলি আজাদ প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন আগামী প্রকাশনীর নির্বাহী ওসমান গনি। হুমায়ুন আজাদের কবিতা আবৃত্তি করেন শিপ্রা রহমান।

নতুন বই: গতকাল অমর একুশে বইমেলার ১৩তম দিনে মেলা চলে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। আজ নতুন বই এসেছে ৭২টি। এর মধ্যে রয়েছে- সাইমন জাকারিয়ার লেখা জনপ্রিয় সাধক কবি শাহ আব্দুল করিমের জীবনীভিত্তিক উপন্যাস 'কূলহারা কলঙ্কিনী' (অন্যপ্রকাশ), আফসানা বেগম অনূদিত উইলিয়াম ফকনারের 'অ্যাজ আই লে ডায়িং' (কথাপ্রকাশ), মোকারম হোসেনের 'বঙ্গবন্ধুর বৃক্ষ ও প্রকৃতি ভাবনা' (উৎস প্রকাশন), ড. মোহাম্মদ আমীনের 'পৌরাণিক শব্দের উৎস ও ক্রমবিবর্তন' (পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স), তামান্না জেনিফার 'যে শহরে বুনোফুলের বাস' (এশিয়া পাবলিকেশন্স), রকিবুল আমিনের 'একাত্তরের গল্প' (সময়), শেখ আবদুল চাষীর 'একাত্তরের বীরাঙ্গনা ও রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ' (উত্তরণ), শব্দশৈলী থেকে মরিয়ম বেগমের 'জীবন সায়াহ্নের কাব্য' ইত্যাদি।

মূল মঞ্চের আলোচনা: গতকাল বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় 'জন্মশতবার্ষিকী শ্রদ্ধাঞ্জলি :সত্যজিৎ রায়' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মইনুদ্দীন খালেদ। আলোচনায় অংশ নেন বিধান রিবেরু ও মোস্তাক আহমাদ দীন। সভাপতিত্ব করেন ম. হামিদ। সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠান।

'লেখক বলছি' মঞ্চ: 'লেখক বলছি' মঞ্চে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন আমিনুর রহমান সুলতান ও মোস্তাক আহমাদ দীন।

অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন গোলাম কিবরিয়া পিনু এবং শিহাব শাহরিয়ার। আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী কাজী মাহতাব সুমন। সাংস্কৃৃতিক পর্বে ছিল জাহিদুল ইসলামের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন 'আরশিনগর বাউল সংঘ'-এর পরিবেশনা।

আজকের অনুষ্ঠান: আজ সোমবার অমর একুশে বইমেলার ১৪তম দিন। মেলা চলবে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আনিসুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, শামসুজ্জামান খান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন গোলাম মুস্তাফা এবং এম আবদুল আলীম। আলোচনায় অংশ নেবেন সারওয়ার আলী এবং সাইমন জাকারিয়া। সভাপতিত্ব করবেন মুনতাসীর মামুন। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠান।