জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব তেৎসুকো কুরোয়ানাগি ১৯৮১ সালে 'তোত্তোচান জানালার ধারে ছোট্ট মেয়েটি' বইটি রচনা করেন। এটি তাঁরই জীবনী। তিনি তাঁর ছোটবেলা তুলে ধরেছেন লেখনীর মাধ্যমে। যে বইটি বিশ্বের ইতিহাসে বইপড়ুয়াদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। একটি দেশের শিক্ষাপদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত, শিক্ষকদের আচার-আচরণের ধরন কেমন হওয়া উচিত- এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েই 'তোত্তোচান' বইটি।
তোত্তোচান প্রথম জীবনে গোয়েন্দা কিংবা গুপ্তচর হতে চান। এরপর রেলগাড়ির টিকিট বিক্রেতা। শিশুমনের চাওয়া, যেখানে কোনো নিয়মের বালাই নেই। শিশু মানেই চঞ্চল। দুরন্ত। উড়ন্ত। প্রতিনিয়ত ভাবনার জগতে ভেসে যাওয়া।
ছোটবেলায় স্কুল মানেই যেন এক বাড়তি বোঝা। যেখানে নেই কোনো আনন্দ-ফুর্তি। শুধু নিয়মকানুন! ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা। নিয়মিত স্কুলে যায়; কিন্তু অমনোযোগী। তার মূল আকর্ষণ খেলাধুলা, গান শোনা। বিড়বিড় করে পাখিদের সঙ্গে গল্প করা। ক্লাস না করে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা। কিন্তু এসব স্কুলশিক্ষকের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক। তোত্তোচান স্কুলে একেকদিন একেক কাণ্ড ঘটিয়ে বসে। বাড়িতে প্রতিদিনই নালিশ আসে। তবুও শোধরায়নি তোত্তোচান। মা কখনও বিভ্রান্ত হন, কখনও বিষয়টি নিয়ে শিশুর সঙ্গে কথা বলেন। এক পর্যায়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
মা তার অসম্ভব মেধাবী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। শিশুর মনে যাতে কোনোভাবে প্রভাব না পড়ে, সেজন্য তিনি স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়টি জানাননি তোত্তোচানকে। এ নিয়ে তার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে মায়েরা বাচ্চাদের ওপর চাপিয়ে দেয় একের পর এক পড়ার বোঝা, যাতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। শিশু দুমড়ে যায়, অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। একাডেমিক চিন্তার বাইরে, পৃথিবী-প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে আর কোনো চিন্তা থাকে না।
তোত্তোচানকে সঙ্গে করে মা হাঁটে- উদ্দেশ্য নতুন স্কুল। তোত্তোচান বেণি ঝুলিয়ে জিজ্ঞেস করে- 'কোথায় যাচ্ছি মা?'
স্কুলের সামনে গিয়ে তোত্তোচান লাফিয়ে ওঠে-
ভারি সুন্দর তো স্কুলটি! নতুন স্কুল। চারদিকে সবুজে ঘেরা। বিশাল আকাশটা যেন হাত দিয়েই ধরা যায়। এটির নাম 'তোমোয়ে গাকুয়েন বিদ্যালয়'। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং হেডমাস্টার সোশাকু কোবাইয়াশি। যে অমনোযোগিতার কারণে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়, সেই তোত্তোচান স্কুলে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এ স্কুলটি রেলগাড়ির কামরার মধ্যে। যেখানে মনের ইচ্ছামতো খেলা যায়। শিক্ষকরা ভালোবাসেন, কথা শোনেন।
হেডমাস্টার সোশাকু কোবাইয়াশি শিশুমনকে বুঝতে, পড়তে পারেন। শিশুদের যে আলাদা জগৎ রয়েছে, সে জগৎকে বিকশিত করার জন্য তাদের প্রতি যত্নশীল হতে হয়। মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো বুঝতে হবে, তা না হলে শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ হবে না। এ বিষয়গুলো শিক্ষক কোবাইয়াশি মনের ভেতরে লালন করতেন। যে চিন্তা থেকেই তিনি 'তোমোয়ে গাকুয়েন বিদ্যালয়'টি প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে 'সমুদ্দুরের কিছু আর পাহাড় থেকে কিছু' দিয়ে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। শিশুদের বাড়ি থেকে ছেঁড়া কাপড় পরে আসার জন্য বলা হতো। যাতে শিশুরা লাফাতে পারে, কাদা মেখে খেলতে পারে।
শিশুদের মনের ওপর ভিত্তি করে চলত ক্লাস রুটিন। যেখানে কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা ছিল না। কেউ ছবি আঁকছে, কেউ গান গাচ্ছে। কেউবা দলবেঁধে পাখির পেছনে ছুটছে। এতে করে কোনো কিছুর ক্ষতি হয়নি। স্কুল ঠিকঠাক চলেছে। বাচ্চারাও আনন্দে পড়াশোনা করেছে। পিকনিক, ক্যাম্পিং, স্পোর্টস সবকিছুতে শিশুরা অংশগ্রহণ করত। এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বাচাদের জন্য ছিল আলাদা ব্যবস্থা, যাতে তাদের ভেতর হীনম্মন্যতাবোধ তৈরি হয় না। আরও একটি অবাক করার মতো বিষয় শিক্ষক মশাই চালু রেখেছিলেন- বাচ্চাদের পুরস্কার হিসেবে সবজি দেওয়া হতো।
'তোত্তোচান' বইয়ের শেষটি ভয়ংকর। বিষাদময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুমুল আঘাত থেকে মুক্তি মেলেনি তোত্তোচানের স্কুলটিরও। যুদ্ধবিমান থেকে পড়া অজস্র বোমার আঘাতে স্কুলটি বিধ্বস্ত হয়। এরপর কোবাইয়াশি সেই স্কুলটি পুনর্নির্মাণ করেন। কিন্তু স্কুলের কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত করার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এ রকম শিক্ষাবিদ, শিশুর প্রতি মনোযোগী, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন শিক্ষক আমাদের সমাজব্যবস্থায় এ সময়ে নেই বললেই চলে। তবুও অন্ধকারে আলো জ্বালাতে হবে, শিক্ষা ক্ষেত্র সুন্দর-সাবলীল করে গড়ে তুলতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে বইটি নতুন চিন্তা ও স্বপ্নের খোরাক জোগাবে। যে স্বপ্নের বীজ বপন হয়েছিল, তাকে প্রতিফলিত করাটা জরুরি। বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশেই শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষাকেন্দ্রিক না হয়ে হয়েছে নম্বরকেন্দ্রিক; যা থেকে বেরিয়ে আসতে এ রকম বইয়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সচেতন বাবা-মায়ের বইটি অবশ্যপাঠ্য বললেও হয়তো ভুল হবে না।
চৈতী রহমান অনূদিত 'তোত্তোচান জানালার ধারে ছোট্ট মেয়েটি' বইটি দ্যু প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়। বই হিসেবে আকারে মাঝারি। সাহিত্যজগতের চরম দুর্দশার সময় এটি অবশ্যই ইতিবাচক বিষয় যে, বাজারে এখন এ বইটির দশম মুদ্রণ চলছে! চৈতী রহমানের অনুবাদ বেশ ঝরঝরে। বাড়তি মেদ নেই। আলাদা সাব হেডে বইটির বিষয়বস্তু তৈরি করেছেন। আক্ষরিকতাকে কাটিয়ে তিনি পাঠকবোধ্য করে তুলেছেন বইটিকে। শব্দচয়ন, বাক্যগঠন এবং রচনাশৈলী সাবলীল, যা পাঠককে সহজেই শেষপ্রান্তে টেনে নিয়ে যাবে।