ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

একুশে বইমেলা

আপনিই শিয়ালমুখীর প্রকৃত প্রেমিক

আপনিই শিয়ালমুখীর প্রকৃত প্রেমিক

কামরুজ্জামান কামু

কামরুজ্জামান কামু

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:৩২ | আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১২:১০

প্রতিবছর বইমেলা এলেই আমি আমার জীবনের ফেলে আসা গ্রামীণ মেলাগুলোর স্মৃতি মনে করে কাতর হয়ে উঠি। সেইসব দিন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। আমি সেই ডাকে সাড়া দিয়ে মনে মনে আমার ধূলিওড়া শৈশবের পথ ধরে দৌড়াতে থাকি। ওগো মোহন-বাঁশি, মেলা থেকে ফেরার পথে আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি! সেই বেদনায় আমি বই লিখি। আর বইমেলায় আমার সেই বই প্রকাশিত হয়। এবারও হবে। যেদিন মেলায় আমার বই আসবে, সেদিন তুমি করুণ সুরে কাঁদিও। 

আমার একার তো নয়, মেলা বিষয়টি আমাদের সমষ্টির স্মৃতিতে চিরভাস্বর। বাঙালি জাতির জীবনে মেলার ঐতিহ্য অনেক পুরোনো, বিশেষ করে চৈত্র-বৈশাখে আমাদের গ্রামবাংলা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মেলার আনন্দে। গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা আমার মতো মানুষের স্মৃতিতে আজও সেইসব মেলা বড় জায়গাজুড়ে রাজত্ব করে চলেছে। সেই হাতি-ঘোড়া-বাতাসার কথা মনে পড়লে সেই রঙিন দিনগুলো যেন ফিরে ফিরে আসে আমাদের হৃদয়ে বারবার। আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় ধারণ করে থাকা এসব মেলা আমাদের শৈশব-কৈশোরকে গড়ে ওঠার রসদ জুগিয়েছে। আমাদের মানস গঠনে গ্রামবাংলার এসব মেলার অবদান অপরিমেয়।

কালক্রমে মানুষের হাত ধরে মেলা চলে এসেছে নগরে। এই ঢাকার বুকেই তো অমর একুশে বইমেলা ছাড়াও কত ধরনের মেলা বসে আজকাল। মেলাগুলো যেন নগরের জানালা। বদ্ধ নগরীর বন্দিজীবনে এসব জানালা দিয়ে রোদ আর হাওয়া এসে গায়ে লাগে। মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হয়, ভাববিনিময় হয়। তাদের হাত কথা বলে; মুখ, চোখ, হৃদয় কথা বলে। যেন এক অপার আনন্দ তাদের বদ্ধ জীবনের কালিমা মোচন করে দেয়। আমরাও সে জন্য বইমেলায় যাই। বই দেখি। বই কিনি। কত রঙের বই! কী বিচিত্র তাদের নাম! বইয়ের লেখকরা অটোগ্রাফ দিলে আমাদের ছোট্ট প্রাণ আনন্দে ভরে যায়। যারা লেখক, তারাও হয়তো পরবর্তী বই লেখার অনুপ্রেরণা বুকে নিয়ে ঘরে ফিরে যান। 

ফলে লেখালেখির পরিসরকে উদ্দীপনাময় করে তোলায় একুশে বইমেলার ভূমিকা অপরিসীম। ভাষা আন্দোলনের মাসে এই বইমেলা অনুষ্ঠানটির মধ্য দিয়ে আমাদের চেতনায় আত্মদানের উপলব্ধির উদবোধন ঘটে। পৃথিবীর ইতিহাসে মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করার সেই অনন্য অধ্যায় আমাদের জাতীয় অহংকারের ব্যঞ্জনায় সিক্ত করে। আমাদের মন ও মননের উৎকর্ষ সাধনে বইয়ের যে ভূমিকা, তাকে আরও ব্যাপ্তি ও দীপ্তিময় করে তোলে এই একুশে বইমেলা।

এ সুযোগে নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন করে নেওয়া একটা আবশ্যক কর্ম। প্রিয় পাঠক, এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে আমার নতুন কবিতার বই– ‘এখানে শিয়ালমুখী ফুল হয়ে ফুটে আছো’। বাংলাদেশের সব গ্রামেই এই ফুলটির দেখা মেলে। পথের ধারে আনাচে-কানাচে অবহেলায় ফুটে থাকা শিয়ালমুতি বা শিয়ালমুখী ফুলের সাহচর্যে আমারও দামাল দিনগুলো কেটেছে একদিন। এত চেনা, এত কাছের, এত প্রাত্যহিক ছিলে তুমি, ওগো ফুল! অথচ তোমার নাম আমরা কেউ মুখেই নিই না! আমি আজ ভরদুপুরে জনসমক্ষে ঘোষণা করলাম– তুমিই আমার শাশ্বত প্রেমিকা। আমি তোমার নামেই বাঁধনহারা, তুমিই আমার হৃদয়ের ইসমে আজম! আমাকে ভুলো না! এবারের বইমেলায় আমি আমার পাঠক সমীপে তোমাকে নিবেদন করছি। তারা যেন তোমাকে তাদের বুকশেলফের সবচেয়ে ওপরের তাকে সযত্নে সাজিয়ে রাখে। তোমার গন্ধে মাতাল হয়ে তারা যেন নিজ নিজ শৈশবের পথপ্রান্তের দিগভ্রান্তিতে হারিয়ে যায়। 

বইমেলাকে বলা হয় লেখক-পাঠকের মিলনমেলা। এই মেলায় যেমন পাঠকরা তাদের হৃদয়-সিংহাসনে আসীন লেখকের সাক্ষাৎ পান, তেমনি লেখকরাও দেখা পান তাদের মুগ্ধ পাঠকের। এই যে বিনিময়, নিজের লেখা সম্পর্কে পাঠকের অনুভূতি জানতে পারার সুযোগ, হয়তো বা গোপনে-গভীরে-গহনে কোথাও লেখকের পরবর্তী অভিমুখ নির্মাণে এর কোনো অবদান থাকে। এই অবারিত নিরাশার তীরে, এই অকূল মানবজন্মে, এই ফেব্রুয়ারির হিমেল হাওয়ায়, আজি বে-আকুল মনে, বইমেলার মাঠে, হে পাঠক, আপনাকে সালাম। আজ আমরা আড্ডায় মেতে মাতিয়ে তুলব সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। খুনসুটির মতো রোদে আমরা বই নিয়ে কথা বলব। বই কীভাবে আমাদের হৃদয় তৈরি করে, তা নিয়ে আমরা তর্ক করব। আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে বইয়ের ভূমিকা নিয়ে আলাপ করব। বই যদি না থাকত, আমাদের ভাষার কী হতো! অতীতের জ্ঞানের আলো আজ আমাদের কীভাবে আলোকিত করত! তিন-পুরুষের গল্পের সীমানা আমরা কীভাবে অতিক্রম করতাম!

আমাদের জ্ঞান, চিন্তা, অনুভূতির বাহক বইকে উপলক্ষ করে এই মেলায় যারা দূর-দূরান্ত থেকে আসবেন, তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ বছরে তো এই একবারই আসে। সারাবছরের প্রতীক্ষা এবার অপার ব্যঞ্জনা হয়ে ফুটে উঠুক একুশে বইমেলার মাঠে। 

 

আরও পড়ুন

×