ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

অগোছালো প্রাঙ্গণে প্রথম ছুটির ভিড়

অগোছালো প্রাঙ্গণে প্রথম ছুটির ভিড়

ছবি-সমকাল

 লতিফুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:৩৪ | আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০৭:১৫

উদ্বোধনের পরদিনই গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় ভিড় বেড়েছিল অমর একুশে বইমেলায়। বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া শিশুপ্রহরে এদিন সন্তানদের নিয়ে মেলায় এসেছিলেন অনেক বাবা-মা। শিশু চত্বরে ঘুরে ঘুরে সন্তানের চাহিদা অনুযায়ী বইও কিনে দিয়েছেন তারা। সিসিমপুরের জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র টুকটুকি, হালুম, ইকরি, শিকুদের সঙ্গে নেচেগেয়ে উচ্ছ্বাস করেছে শিশুরা। দুপুর ১টায় শিশুপ্রহর শেষ হলে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ভিড় বাড়তে থাকে সাধারণ ক্রেতা পাঠকের। সন্ধ্যার মধ্যেই লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে মেলা। তাদের কেউ নতুন বইয়ের সঙ্গে খুঁজেছেন প্রিয় লেখকের সান্নিধ্য, কেউ স্টলে স্টলে ঘুরে জোগাড় করেছেন নতুন বইয়ের তালিকা। কিন্তু যে ক্রেতা পাঠক আকর্ষণের জন্য এত আয়োজন, তা এখনও গুছিয়েই উঠতে পারেনি মেলা কর্তৃপক্ষ। উভয় প্রাঙ্গণে গতকালও দেখা গেছে বিভিন্ন স্থানে ময়লার স্তূপ। কোথাও টুকরো কাঠ, বাঁশ, শোলাসহ স্টল নির্মাণসামগ্রীর নানা উচ্ছিষ্ট রাখা হয়েছে, কোথাওবা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে খাবারের প্যাকেট, কফির কাপসহ নানা জিনিস। মেলার এমন অপরিচ্ছন্ন অবস্থা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন আগত অনেকে।

মেলার এমন অগোছালো অবস্থার জন্য অবশ্য স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলোও দায়ী। গতকালও চলছিল অনেক স্টল ও প্যাভিলিয়নের নির্মাণকাজ। কেউ কেউ তো স্টলে এখনও বইও সাজাতে পারেনি। এ ছাড়া মেলা মাঠে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় স্টলগুলো থেকে কাগজ, শোলা, দুপুরের খাবারের প্যাকেটসহ নানা আবর্জনা মাঠেই স্তূপ করে রাখছেন অনেকে। বিকেলে বিদ্যা প্রকাশ প্যাভিলিয়নের সামনে আড্ডা দিচ্ছিলেন কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল, পলাশ মজুমদারসহ কয়েকজন। পাশেই পড়েছিল নানা রকম আবর্জনা। এর মধ্যেই পার্শ্ববর্তী একটি স্টল থেকে আবার খোলা মাঠে আবর্জনা ফেলা হয়। বিষয়টি নিয়ে মোহিত কামাল ও পলাশ মজুমদার সেই স্টলের বিক্রয়কর্মীকে বললেও তিনি জবাব না দিয়ে সরে যান। সন্ধ্যার দিকে অনিন্দ্য প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নের সামনে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় নির্মাণসামগ্রী। তখনও কাঠ, শোলা, রংতুলি নিয়ে মিস্ত্রিরা কাজ করছিলেন সেখানে। বাংলা প্রকাশের ব্যবস্থাপক রহিম শাহ্ বলেন, ‘এখনও প্যাভিলিয়নের কাজ পুরা শেষ হয়নি। সময় পেয়েছি কম। তার পরও মোটামুটি কাজ শেষে বই সাজিয়েছি। কিছু টুকটাক কাজ বাকি, তা রাতে মেলা শেষে মিস্ত্রিরা করবে।’ 

আগামী প্রকাশনীর সামনে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখন আর বইমেলা নেই, যা আছে তা এলোমেলো, বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় বইয়ের হাট। বইমেলা এত বড় করার দরকার ছিল না। কারণ, দেশে যথার্থ প্রকাশক হাতেগোনা। বাংলা একাডেমিতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মেলাকে বিস্তৃত করে এলোমেলো করা হয়েছে। চারদিকে আবর্জনা ও ধুলাবালির স্তূপে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।’

এবারও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেকপাড়ে একটি মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। গত বছর সেখানে মোড়ক উন্মোচন মঞ্চ করলেও এ বছর দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে কী হবে। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ওপরে শুধু একটা ছাউনি এবং নিচে চৌকি দিয়ে বানানো এ মঞ্চ খালিই পড়ে ছিল। দেখা যায়নি কোনো ব্যানার, ছিল না কোনো চেয়ার, টেবিল।

সময় প্রকাশনীর সামনে কথা হয় তরুণ কবি স্নিগ্ধা বাউলের সঙ্গে। তিনি জানান, এ বছর সময় প্রকাশন থেকে এসেছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘সভ্যতা এক আশ্চর্য খোঁয়ারি হাঁস’। আরও একটি কাব্যগ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত পদাবলী’ও আসবে শিগগির। সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক সাদাত হুসাইনের সঙ্গে কথা হয় অন্যধারার স্টলে। এ প্রকাশনী থেকে এসেছে তাঁর উপন্যাস ‘তোমার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম বলে’। ভক্তপাঠকদের অটোগ্রাফ দিতে ব্যস্ত সাদাত বলেন, ‘এক বছর প্রতীক্ষার পরে বইমেলা এসেছে। ভীষণ ভালো লাগছে।’

এদিকে গতকাল বেলা সোয়া ১১টায় শিশুচত্বরে সিসিমপুর মঞ্চ উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। এ সময় সিসেমি ওয়ার্কশপ বাংলাদেশের এমডি মোহাম্মদ শাহ আলম, বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব কে এম মোজাহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনের পর দুপুর ১২টার দিকে শিশুচত্বরে একে একে হাজির হয় পাপেট চরিত্র টুকটুকি, হালুম, শিকু, ইকরি। নাচের তালে তালে শিশুদের মুগ্ধ করে তারা। টুকটুকি এসে সবাইকে বই পড়তে বলে। প্রশ্ন করার আহ্বান জানায় ইকরি। হালুম শোনায় মাছ খাওয়ার গল্প আর নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কারের কথা জানায় শিকু।

শিশুপ্রহর উদ্বোধন করে শিশুদের উদ্দেশে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নূরুল হুদা বলেন, ‘শিশুদের জন্মের পর থেকেই শব্দ শেখাতে হবে। বাঙালি শিশু জন্মের পর বাংলা শব্দ, ইংরেজ শিশু ইংরেজি এবং আরব শিশু আরবি শব্দ শিখবে। সিসিমপুর কিন্তু কোনো বিশেষ ভাষার শব্দ নয়; সারা পৃথিবীর ভাষার একটি শব্দ। সিসিম হচ্ছে একটি গুহা। এই গুহাতে যদি তোমরা ঢোকো তাহলে দেখতে পাবে, সারা পৃথিবীর জ্ঞানভান্ডার তোমার সামনে উন্মুক্ত হবে।’

বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা যায়, গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ৩১টি। এগুলোর মধ্যে অন্যতম সৈয়দ আনোয়ার হোসেন সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : অ্যা প্রোফাইল ইন লিডারশিপ’, নূহ-উল-আলম লেনিনের ‘শেখ হাসিনা : ঝড়ের খেয়ার কান্ডারি’ (ঝুমঝুমি), কামাল চৌধুরীর ‘কবিতার অন্বেষণ কবিতার কৌশল’ (পাঠক সমাবেশ),  আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’ (আগামী), আবুল কাশেমের ‘বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অর্থনীতি’ (অন্যপ্রকাশ), রবীন্দ্র গোপের ‘ছাগলের হাসি ও একটি পাউরুটি’ (বিভাস)।

আরও পড়ুন

×