আসছে বাজেট: বিশেষজ্ঞ মত

কর্মহীনদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০     আপডেট: ০৭ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আহসান এইচ মনসুর

আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রধানত তিনটি জায়গায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ এবং যারা সংক্রমিত হয়েছে এবং হবে তাদের পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি। এর উন্নতি না হলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকতে হবে। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানো যেতে পারে। তবে শুধু বরাদ্দ দিয়ে হবে না, সেবার মান বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়াতে হবে। যাতে তারা রোগীদের সেবা দিতে সাহস পায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দক্ষতা আনতে না পারলে সংক্রমণের বিস্তার কমানো যাবে না। এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হতে পারে। অন্যদিকে, এই ভাইরাস ঠিকমতো মোকাবিলা করতে পারলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি হবে। রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনা বাড়বে। এর সফল প্রতিরোধ ব্যবস্থা সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের সোপান হিসেবে কাজ করতে পারে।

এর পরই বিশেষ নজর দিতে হবে যেসব মানুষ করোনা পরিস্থিতির কারণে উপার্জনহীন হয়ে সমস্যায় পড়েছেন তাদের দিকে। হঠাৎ করে সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের ব্যাপক সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। বিশেষ করে শহরে বসবাস করা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মকাণ্ডে জড়িত জনগোষ্ঠী। এদের একটি অংশ গ্রামে চলে গেছেন, আর অনেকে শহরেই আছেন। সরকার এদের জন্য কিছু উদ্যোগ নিলেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। আবার সেই উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়নে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম আছে। বাজেটে এই ধরনের জনগোষ্ঠীর ছয় মাসের সহায়তার জন্য ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থাকতে পারে। তবে এই বরাদ্দ সুনির্দিষ্ট করে আলাদাভাবে রাখতে হবে। সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করার পদ্ধতিও হতে হবে সুনির্দিষ্ট, যাতে অনিয়ম না হয়। সমস্যাগ্রস্তদের হাতে নগদ টাকা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

তৃতীয়ত, অর্থনীতিকে গতিশীলতার জন্য বাজেটে উদ্যোগ থাকতে হবে। যে প্রণোদনা প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো প্রধানত ব্যাংকনির্ভর। সরকার সুদ ভর্ভুকি দেবে। তবে বাজেটেও এ বিষয়ে বরাদ্দ থাকা দরকার এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন উদ্যোগ থাকতে হবে। এজন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি মনিটরিং কমিটি থাকা দরকার। এই কমিটি কোন খাতে কী চাহিদা, কী বরাদ্দ ও বিতরণ হয়েছে দেখবে। কমিটি বাস্তবায়নের সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনে বরাদ্দ পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে সরকার ও জনগণের মধ্যে একটা সম্পর্ক থাকা দরকার। সরকার নির্দিষ্ট সময় পরপর এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এসব বিষয়ে বাজেটে ঘোষণা থাকতে পারে। মোটকথা, কর্মসংস্থান ধরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা থাকতে হবে বাজেটে। কর্মসংস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে বর্তমানে বিশ্বে দুটো মডেল আছে। একটি জার্মান মডেল রয়েছে, যেখানে ছাঁটাই না করার শর্তে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সরকার ১০০ ভাগ বেতন-ভাতা দিচ্ছে। আর যুক্তরাজ্য একই শর্তে ৮০ শতাংশ বেতন-ভাতা দিচ্ছে। আরেকটি মডেল রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। সেখানকার সরকার কিছুই করছে না, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা ঠিক করছেন। এ জন্য জার্মানিতে বেকারত্বের হার মাত্র ৪ শতাংশ। আর যুক্তরাষ্ট্রে তা ২০ শতাংশে ঠেকেছে। আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশের বেতন-ভাতা দেওয়ার সক্ষমতা নেই। কিন্তু জীবন-জীবিকার জন্য সরকারকে সমস্যাগ্রস্ত জনগণের পাশে থাকতে হবে। নূ্যনতম সহায়তা করতে হবে। আনুষ্ঠানিক খাতে অনানুষ্ঠানিক খাতের মতো মাসিক তিন হাজার টাকা করে সরকার দিতে পারে। এজন্য বাজেটে বরাদ্দ দরকার। পাশাপাশি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করার উদ্যোগ থাকতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মহীন হয়ে পড়াদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি করার ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী নিজে নিবন্ধিত হতে পারেন এমন ব্যবস্থা নিতে হবে।

শিক্ষা খাতে বিশেষ উদ্যোগ দরকার। এ খাতে শুধু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে হবে না। ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে বরাদ্দ বাস্তবায়ন জরুরি। শিক্ষার মানোন্নয়ন জরুরি। অন্যদিকে, মেগা প্রকল্প যেন মুখ থুবড়ে না পড়ে বাজেটে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। অন সাইট কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করতে হবে। সম্প্রতি দেখা গেছে, বিদেশি নাগরিকরা মেগা প্রকল্পে কাজ করলেও দেশি কর্মীরা অনুপস্থিত। প্রায় তিন মাসের সাধারণ ছুটির পরও ঈদের ছুটিতে থাকছেন কর্মীরা। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে বিশেষ পরিকল্পনা দরকার। এসবের বাইরে এ বছরের বাজেটে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। কোথায় কী প্রয়োজন হবে, তা এখনই ধারণা করা যাচ্ছে না। এ জন্য থোক বরাদ্দ থাকলে যে কোনো ক্ষেত্রে তা ব্যয় করা যাবে। সবশেষে বলব, আসন্ন বাজেটে কর ও ভ্যাটে নতুন কোনো উদ্যোগ না নেওয়াই ভালো। কোনো কিছুই বাড়ানোর দরকার নেই। মোবাইল ফোন ব্যবহার ও ব্যাংকের সঞ্চয় থেকে আয় বাড়ানোর চেষ্টা দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি করতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ থেকে বিরত থাকাই ভালো। আর পুঁজিবাজার উন্নয়নে যেসব সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক :নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)।