এফবিসিসিআইর আলোচনা সভা

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর দেওয়ার পরামর্শ

আসছে বাজেট

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২০     আপডেট: ০৮ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

মহমারি করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। তারা দেশীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকবিলায় বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও কর সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করেছেন।

গতকাল রোববার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত এক অনলাইন আলোচনা সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন তারা। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার নিয়ে এ আলোচনার আয়োজন করে এফবিসিসিআই।

আলোচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, সরকারের ঘোষণা করা প্রণোদনা প্যাকেজের কার্যকর বাস্তবায়ন হলে করোনা মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। গত কয়েক বছর গরিব, কৃষি, ব্যবসা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাবান্ধব বাজেট হয়েছে। এবার চাকরিবান্ধব বাজেট হবে আশা করে তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ জোর দিতে হবে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৃষিপণ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে মহামারির সময়ে যাতে খাদ্যের সংকট না হয়, সেজন্য করোনা আসার পরও কৃষকরা উদ্বৃত্ত উৎপাদন করে আসছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য রপ্তানিতেও নজর দিতে হবে। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এখন কৃষিপণ্য উৎপাদনকে কাজে লাগাতে হবে। করোনাকালে এই সুযোগ কাজে লাগানোর সঠিক সময়। শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, করোনা বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তন কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, বর্তমান সময়ে দেশ অনেক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা আছে। তৈরি পোশাকসহ সব খাতের ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন। তিনি আশা করেন, এই সংকট কাটিয়ে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, এখন স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করতে হবে। টেলিমেডিসিন সেবাকে আরও বেশি সক্রিয় করতে অবশ্যই স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে আইটি ব্যবস্থাকেও একত্রিত করতে হবে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান বাড়াতে সংকটের এই সময়ে স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা আগামী বাজেটে বেশ গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আনতে নানা ধরনের সুযোগ দেওয়া হবে।

এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, আগামী দিনে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে প্রণোদনা ও কর সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসএমই উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে ভ্যাটের হার কমাতে হবে। এ ছাড়া আগাম কর (ভ্যাট) প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেন, আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে অন্য দেশে যাচ্ছে। জাপানের উদ্যোক্তারাও অন্য দেশে ব্যবসা স্থানান্তর করছে। তাদের বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি বাড়াতে হবে। কারণ দক্ষ জনশক্তি না থাকায় দেশ থেকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে।

এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেন, এখন সময় দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার। সারাদেশের শিল্পকারখানায় ইপিজেডের মতো সুবিধা দিতে হবে। চলমান পরিস্থিতিতে যে পণ্য রপ্তানি করতে সমস্যা হচ্ছে তা দেশের বাজারে সরবরাহের পরামর্শ দেন তিনি।

এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, কৃষকরা চলমান সংকটকালীন সময়ে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে। তাই কৃষি খাতের ঋণ প্যাকেজের সুদহার আরও কমানোর প্রস্তাব দেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাত সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। তার ওপর সরকার ব্যাংক ঋণভিত্তিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এতে প্রণোদনা বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবশ্যই সহযোগিতা করতে হবে। করোনা-পরবর্তীতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিডা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশের ভাবমূর্তি বাড়াতে কাজ করছে। ইতোমধ্যে সহজ ব্যবসা সূচকের বিভিন্ন কাজে অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে আরও অনেক বিষয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণে অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিয়েছে বেজা। পাশাপাশি বিনিয়োগের সুবিধা বাড়াতেও কাজ চলছে। প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে সক্ষমতা বাড়াতে শুল্ক্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার প্রস্তাব দেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মারসি মিয়াং টেম্বন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজ সঠিক বাস্তবায়ন হওয়া দরকার। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে নীতি ও আর্থিক সহায়তা আরও বাড়াতে হবে।

এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর মন মোহন প্রকাশ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিতে আরও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সচ্ছতা আনতে হবে।

বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো তৈরি এবং দক্ষ জনশক্তি বাড়ানোর পরামর্শ দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, করোনা মোকাবিলায় প্রথমে স্বাস্থ্য খাতের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক সংকট চলছে। এ অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি খাতে প্রণোদনা দিতে হবে।

এফবিসিসিআইর সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, করোনা সংকট মোকাবিলায় কর্মসংস্থান তৈরির কোনো বিকল্প নেই। কারণ ইতোমধ্যেই লাখ লাখ কর্মী বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় করোনা সংকট মোকাবিলা করতে হবে। সরকার যে প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তার পাশাপাশি কর হার কমিয়ে আনা প্রয়োজন।

আলোচনায় আইডিবির আঞ্চিলিক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাসিস বিন সুলাইমান, আইএমএফের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট মুহাম্মদ ইমাম হুসাইন, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পো, এফবিসিসিআইর উপদেষ্টা সনিয়া বশির কবির ও আবদুল হান্নান প্রমুখ অংশ নেন।