আসছে বাজেট :বিশেষজ্ঞ মত

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দুর্নীতি বাড়াবে

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

প্রতি বছরই বাজেট হয় এবং তা গতানুগতিকই থাকে। কিন্তু এবারের বাজেট অন্যান্য বারের মতো হওয়া উচিত হবে না। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, আমাদের বাজেটে মৌলিকত্ব থাকে না। 'কাট-পেস্ট' ধরনের বাজেট হয়। আগের বছরের বাজেট একটু বড় করে, কিছু ক্ষেত্রে কাটছাঁট করে নতুন বাজেট করা হয়। জনগণ কী চায়, সময়ের প্রয়োজনটা কী- এসব বিষয়ে যারা বাজেট তৈরি করেন, তারা শুনতে চান না বা তা শোনারও কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্য দেশে এভাবে বাজেট হয় না। প্রতিবেশী ভারতের কথাই ধরা যাক। সেখানে বাজেট করার আগে সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়। সংসদে বাজেট পেশের পর অন্তত এক সপ্তাহ আলোচনা হয়। আগে এমন বাধ্যবাধকতা ছিল না, এখন আইন করে তা নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে আলোচনার পর বাজেট পরিবর্তন হয়।
আমার মনে হয়, ভালো বাজেট করার ক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক সংলাপের বিকল্প নেই। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান এটা করতেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবও কিছুটা করতেন, তবে কতটা আমলে নিতেই তা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। কিন্তু এবার ওই শোনারই আগ্রহ দেখা যায়নি। হতে পারে করোনার কারণে। কিন্তু চাইলে ভার্চুয়াল সভা করে অনেকের মতামত নেওয়া যেত। কিন্তু তা করা হয়নি।
যা হোক, করোনায় সরকারের এরই মধ্যে বড় খরচ হয়েছে এবং জনগণের বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খুবই খারাপ অবস্থা। যেখানে সরকার দেশের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০ শতাংশ বলে দাবি করে, এবার নিশ্চয় তা ২৪ শতাংশ বা তারও বেশি ছাড়িয়ে যাবে। এমন একটি পরিস্থিতিতে টাকার দরকার। কিন্তু অনেক বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে না। কারণ যারা কর দেন, তাদের অবস্থাও এখন ভালো নয়। বিশেষ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্পপতিরাও বেশ অসুবিধার মধ্যে আছেন। যতটুকু জানা যাচ্ছে, দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প তৈরি পোশাকে কাজকর্ম খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। এর কারণ বিদেশ থেকে তারা রপ্তানি আদেশ পাচ্ছেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই স্বাভাবিক। এটা বৈশ্বিক সংকট। কাজেই সেখান থেকে বৈদেশিক আয় কম হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও তেমন হবে বলে মনে হয় না।
সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা করছাড়সহ নানা প্রণোদনা দাবি করছেন। তবে এমনিতেই আমাদের কর আদায় কম। তার ওপর এবার আরও কমে যাওয়ার শঙ্ক রয়েছে। সরকার এরই মধ্যে যেসব ভর্তুকি সুদের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সেগুলো বাজেটের মধ্যে নিয়ে আসতে পারে। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করছি, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরকারের ঋণ প্রণোদনা সহায়তা পেলেও এসএমই প্রতিষ্ঠান হয়তো সেভাবে পাচ্ছে না। এটা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। করোনার কারণে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষত রপ্তানি বাণিজ্য ধরে রাখতে অর্থনৈতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
করোনার বহু আগে থেকেই আমাদের শেয়ারবাজারের অবস্থা খারাপ ছিল। এখনও অনেক খারাপ। কিন্তু বাজেটে এর জন্য কিছু করার আছে বলে মনে হয় না। শুনতে পাচ্ছি, এবার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হবে। এ ব্যাপারে বরাবরের মতোই বলব, কালোকে সাদা করার সুযোগ শুধু দুর্নীতিকেই বাড়াতে পারে। এর থেকে সরকার বা অর্থনীতির কোনো লাভ হয় না। যাদের বড় অঙ্কের অবৈধ টাকা আছে, তারা তা দেশে রাখেন না। সুযোগ পেলেই বিদেশে পাচার করে দেন এবং আমরা বা আমাদের ব্যবস্থা দিয়ে কখনই তা ঠেকাতে পারিনি। শেয়ারবাজারের এতদিনে বড় সংকট ছিল সুশাসনের। যার অভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট ছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে নতুন নেতৃত্ব আসায় আশা করছি অবস্থার পরিবর্তন হবে।
আশার কথা, এবার কৃষিতে ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু এ খাত থেকেও কর আসার সম্ভাবনা নেই। সে কারণে বলতেই পারি, এবার সরকারের রাজস্ব আয় ভালো হবে না। এই অবস্থার মধ্যে বড় বাজেট করার অর্থ হবে এমন একটি অট্টালিকা তৈরি, যা অচিরেই ধসে পড়বে। কারণ বড় অঙ্কের বাজেট আপনি করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবায়নে গিয়ে যখন অঙ্ক ছোট হতে থাকবে, অর্থাৎ ঘাটতি বড় হতে থাকবে তখন এ বাজেট অসারে পরিণত হবে। বড় বাজেটের বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার স্বভাবতই ব্যাংক ঋণে বড় বেশি নির্ভর হয়ে পড়বে। প্রতিবারই সরকার এমনটিই করে থাকে। আর একটি খাত থেকে সরকার ঋণ নিয়ে থাকে, তা হলো সঞ্চয়পত্র। তবে এখানে বিনিয়োগে কড়াকড়ি আরোপের ফলে মনে হয় না সরকার এখান থেকে খুব বেশি অর্থ পাবে।
ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিতে থাকলে সেখানেও সংকট তৈরি হবে। কারণ যতটা জানতে পেরেছি, চলতি করোনা সংকট মোকাবিলায় সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েই প্রয়োজন মিটিয়েছে। আবার এ সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের জন্য যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে তার প্রায় পুরোটা ঋণভিত্তিক। এ ঋণের অর্থ জোগান দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলো হিমশিম খাবে। এটা ঠিক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ক্ষেত্রে কিছু সহায়তা দিচ্ছে। তবে এ সহায়তার পরও সুদহারে নয়ছয়সহ আরও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে আমার মনে হয় না ব্যাংকগুলোর কাছে যথেষ্ট তারল্য আছে। ফলে ব্যাংক থেকে সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে কতটা ঋণ নিতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
এই যখন অবস্থ তখন বড় বাজেটের পথে না গিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য ছোট বাজেট ঘোষণা করে তাহলে কেউ কিছু মনে করত না। বরং ওই ছোট বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে সরকার বাহবা পাবে। সংসদে বাজেট ঘোষণা হওয়ার পরও ছোট করা যায়। কিন্তু তার রেওয়াজ নেই, বর্তমান ধারায় তা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা আইএমএফ থেকে স্বল্প বা বিনা সুদে ঋণ নিতে পারে। যতটুকু জানি, আইএমএফ হয়তো কিছুটা ঋণ দেবে। এখান থেকে যতটা পাওয়া যায়, তা নিয়ে বাজেটের আকারটা ছোট করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
করোনার এ সময়ে স্বাস্থ্য খাতের অনেক দুর্বলতা বেরিয়ে এসেছে। ফলে এখানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকার তার সামর্থ্যের মধ্যে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াবে বলে আশা করি। একই সঙ্গে শিক্ষায়ও বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এ দুটি খাতের বিনিয়োগ মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়তা করবে ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভিত মজবুত করবে।
তবে এবার করোনা উত্তরকালে দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষের জন্য যে সহায়তা অর্থাৎ সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে যে বরাদ্দ রাখা হবে তা ছোট হলে চলবে না। এ ক্ষেত্রে কোনো ঋণ নয়, সরাসরি অনুদান দিতে হবে। যাতে তাদের না খেয়ে থাকতে না হয়। যারা চাকরি হারাবে তাদের জন্যও বাজেটে কিছু বরাদ্দ রাখা উচিত হবে।

লেখক : সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক