আসছে বাজেট :বিশেষজ্ঞ মত

কর্মকৌশল নিতে হবে তিন বছরের

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ

এবার গতানুগতিক বাজেট হলে হবে না। এবারের বাজেটে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব করলে চলবে না। বাজেট হতে হবে সুনির্দিষ্ট একটা কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে সরকার কী করতে চায়, বাজেটে তার উল্লেখ করতে হবে। আগে থেকেই আমাদের অর্থনীতিতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ ছিল। নতুন করে করোনার প্রভাব দেখা দেওয়ায় সংকট বেড়েছে।
আমাদের এমনিতেই কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ আছে। এখন আবার বিদেশ থেকে অনেকে চলে আসছে। অন্যদিকে, আয় বৈষম্য আছে। সম্পদের সুষম বণ্টন নেই। আবার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট আছে। ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারে আগে থেকেই সংকট আছে। এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে এই করোনা। করোনাভাইরাসের প্রভাবে আমদানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বাজেটে একটা সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে। এসব সমস্যা এক বছরে সমাধান হবে না। এজন্য একটা কর্মকৌশল নিয়ে এগোতে হবে। এই কৌশল শুধু আগামী বাজেট নয়, পরের দুটি অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে যোগসূত্র থাকতে হবে। চূড়ান্তভাবে এটা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে যোগসূত্র থাকবে। কৌশল ঠিক না করে শুধু বরাদ্দ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
এখন বরাদ্দের কথায় আসি। বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমি মনে করি, স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এখন এটা জিডিপির ১ শতাংশের নিচে আছে। একে ২ থেকে ৩ শতাংশে নিতে হবে। অন্যদিকে, এ খাতের বরাদ্দ বাজেটের ৫ শতাংশের মতো আছে, যা ১০ থেকে ১২ শতাংশে নিতে হবে। শুধু ব্যয় করলেই হবে না, পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। মানুষ বড় শহর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত যেন সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ওপর ভরসা করলে চলবে না।
দ্বিতীয়ত, কৃষি খাতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেননা কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি বলতে ফসল চাষ, মৎস্য ও পশু পালন- সব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এখানে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা যথেষ্ট নয়। বরাদ্দ ছাড়াও কৃষিপণ্য বিপণনের দিকটা দেখতে হবে। বিপণন সমবায় পদ্ধতিতে কতটুকু হবে এবং সরকার কতটুকু কিনবে তা আগে থেকে ঠিক করতে হবে। আবার ভর্তুকি ও ঋণ সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা খাতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুঃখজনকভাবে আমাদের এখানে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নেই। শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য নয়, সম্ভব হলে সবার জন্য স্বাস্থ্য বীমা বা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। সামাজিক সুরক্ষার আওতায় যে বয়স্ক ও বিধবা ভাতা আছে, তার পরিধি বাড়াতে হবে। উন্নত দেশে বেকার ভাতাসহ নানান সামাজিক সুরক্ষা আছে। যুক্তরাষ্ট্রে সবাই বেকার ভাতা পাচ্ছেন। আর নরওয়ে, সুইডেন তো কথাই নেই। আমাদের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতের বড় অংশই অবসর ভাতা। চতুর্থত, শিক্ষা খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি না করলে বাইরে থেকে যারা চলে আসছে, তারা আর যেতে পারবে না। শিক্ষা বলতে ব্যবহারিক, কারিগরি, আইটি সব ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
বাজেটে মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে। শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই জীবন নয়। সব মিলিয়ে কল্যাণমুখী বাজেট দিতে হবে। জনবান্ধব বাজেট হতে হবে। সাধারণ মানুষের জন্য কিছু থাকতে হবে।
রাজস্ব খাতে অহেতুক ব্যয় কমাতে হবে। করপোরেট কর, ভ্যাট ও আয়করের হার না বাড়িয়ে আওতা বাড়াতে হবে। সক্ষম দুই-তৃতীয়াংশ লোক কর দেয় না। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের অনেক ব্যবসায়ী আছেন, যারা সচ্ছল অথচ কোনো দিন কর দেননি। এদের করের আওতায় আনলে আর করহার বাড়াতে হবে না। যারা কর দেয়, তাদের ওপর চড়াও না হয়ে নতুন লোকজনকে করজালে আনতে হবে।
এবারের বাজেটে ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশে থাকবে না। এটা ৬ কিংবা ৭ শতাংশ হতে পারে। এতে কোনো আপত্তি নেই। তবে এই ঘাটতি মেটানোর জন্য ব্যাংক খাত থেকে ধার না করে সরকার বিদেশি উৎস থেকে বেশি ঋণ নিতে পারে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফসহ বিভিন্ন সংস্থা ঋণ দেওয়ার কথা বলেছে। কোনো সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট নেওয়া উচিত হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে পুনঃঅর্থায়নসহ বিভিন্ন উপায়ে অর্থ তৈরি করছে। আরও অর্থ তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি তার ব্যালেন্সশিট বাড়ায় তাতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত সহজ হবে। এসব অর্থ যদি সঠিক খাতে ব্যয় হয় মূল্যস্ম্ফীতি কোনো বিষয় হবে না। সরকারি ব্যাংকে আর পুনঃমূলধনীকরণ করা ঠিক হবে না। এমনিতেই টাকার স্বল্পতা আছে। আবার বেসরকারি ব্যাংক আর রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এখন সমান সুদহারে ঋণ দিচ্ছে। তারা চলতে পারলে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক কেন পারবে না।
শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে রাজস্বনীতি ঢেলে সাজাতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রকল্পের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। অনেক প্রকল্প আছে, যা এ সময়ে বাস্তবায়ন করার কোনো দরকার নেই। এখন গুরুত্ব দিতে হবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর। দুর্নীতি যেন না থাকে, আইনের শাসন যেন থাকে, সেদিকে জোর দিতে হবে। সরকার চাইলেই এটা করতে পারে। এ জন্য নতুন করে আইনের দরকার নেই।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক