বিশেষ লেখা

সাদা, কালো ও ধূসর বাজেট

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২০     আপডেট: ১২ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

জাহিদ হোসেন

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে সাদা, কালো আর ধূসর- এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়। কারণ এ বাজেটে কিছু পদক্ষেপ আছে পরিস্কার অর্থাৎ অগ্রাধিকার কী এবং কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা স্পষ্ট। ফলে এ অংশকে সাদা বলা যাবে। আর কিছু উদ্যোগ আছে যেগুলোতে কী করা হবে তা বোঝা যাচ্ছে; কিন্তু অগ্রাধিকার স্পষ্ট নয়। এই অংশকে কালো বলব। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটের ধূসর অংশ হলো, কিছু বিষয়ে বলা হয়েছে; কিন্তু অস্পষ্টভাবে। সেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই, অগ্রাধিকার নেই।
অর্থমন্ত্রী করোনা মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছেন। এই টাকাটা সম্পূর্ণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
করোনাভাইরাসের অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ফলে এর ভ্যাকসিন ও ওষুধ আবিস্কার হলে সেগুলো সংগ্রহ করা, টেস্টিং, ট্রেসিং ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই হঠাৎ করে অর্থ লাগতে পারে। ফলে এ ধরনের বরাদ্দ খুবই ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এ ছাড়া এই সংকটকালীন খাদ্য নিরাপত্তা জরুরি। কৃষি খাতে দুই হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আরেকটু বেশি বাড়ানো গেলে আরও ভালো হতো। এরপরও বলতে হবে, এই উদ্যোগও যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। অন্যদিকে করোনাকালীন বেশিরভাগ পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। এরকম অবস্থায় ব্যক্তি আয়করের সীমা বাড়ানো এবং আয়করের প্রতিটি স্লাবে কর হার কমানো খুবই ভালো উদ্যোগ। এসব উদ্যোগকে বলব বাজেটের সাদা অংশ।
করোনা মোকাবিলায় বিশেষ তহবিল ঘোষণা করা হলেও প্রকৃত স্বাস্থ্য খাতে অর্থাৎ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে বরাদ্দ বিশেষ বাড়েনি। ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় মাত্র চার হাজার ২৭৩ কোটি টাকা বেড়েছে; কিন্তু দেশে মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে না। করোনাবহির্ভূত স্বাস্থ্যসেবায় বড় সংকট দেখা দিয়েছে। এই ঘাটতি দূর করতে স্বাস্থ্য খাতে সরাসরি বরাদ্দ দরকার ছিল; কিন্তু তা হয়নি। অন্যদিকে পরিবহন খাতে এত বরাদ্দ বাড়ানোর দরকার ছিল না। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষা খাতে যতটা বরাদ্দ ও উদ্যোগ আশা করা হয়েছিল ততটা প্রতিফলিত হয়নি। সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও দুর্যোগ, নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি রয়েছে তার তুলনায় বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। বলা যায়, প্রয়োজন ১০০ টাকা হলে, বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক টাকা। এদিকে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে তাকে 'কঠিন' বললে কম বলা হবে। এ লক্ষ্য অর্জন একেবারেই অসম্ভব। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধিও হবে অসম্ভব। রাজস্ব নীতিতে কিছু সংস্কারের চেষ্টা দেখা গেছে বাজেটে। যেমন বিলাস পণ্যে কর বাড়ানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এ খাত থেকে আয় বাড়বে। কিন্তু এ সময়ে কি মানুষ বিলাস পণ্য কিনছে কিনা বা কিনবে কিনা সেটা তো বড় প্রশ্ন। অন্যদিকে মোবাইলের সিমে কর বাড়ানো হয়েছে। যেটা অনেকটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। মানুষকে ঘরে রাখতে হলে তার যোগাযোগ সহজ করতে হবে। কিন্তু মোবাইলের সিম বা ব্যবহারে খরচ বাড়লে সেটা কমবে। মানুষ ঘরের বাইরে আসবে। এটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হয়নি। এদিকে বাজেটে ঘাটতি মেটানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন কঠিন বা বলা যেতে পারে সম্ভব নয়। এই উদ্যোগুলোকে কালো বলছি।
আর ধূসর বা অপরিস্কার হচ্ছে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশের বেশি হবে। এর বড় অংশ প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার বিদেশি অর্থায়ন থেকে মেটানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইতোপূর্বে বিদেশি অর্থায়ন গ্রহণের সক্ষমতা থেকে তা প্রমাণ হয় না। বর্তমানে ৪৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশি অর্থায়ন পাইপলাইনে রয়েছে। এর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত (আগে যতটা ব্যবহার করা গেছে তার সর্বোচ্চ হিসাবে) ব্যবহার করা যায় তাতে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার আসতে পারে। অন্যান্য উপায়ে অর্থাৎ করোনাভাইরাসের কারণে যেসব নতুন উইন্ডো তৈরি হয়েছে সেগুলোর মাধ্যমে আরও দেড় বিলিয়ন ডলার আসতে পারে। কিন্তু ১১ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়াটা বেশ কঠিন। ফলে ঘাটতি মেটানো অসম্ভব পর্যায়ে চলে যাবে। এদিকে অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ঘাটতি মেটানোর জন্য ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকাররা নিরাপত্তা ও সহজ ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় সরকারকে ঋণ দিতে আগ্রহী হবে। তবে এই পরিমাণ অর্থ সরকার নিলে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্যাকেজ বাস্তবায়ন কঠিন হবে। এই প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকারদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। আর ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে ব্যয় সাশ্রয়ী হতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে, রপ্তানির যেসব খাতে প্রণোদনা জরুরি নয় এমন জায়গায় খরচ কমাতে হবে। আর উন্নয়ন বাজেটে প্রাধিকার করে অর্থ সাশ্রয় করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা নিলে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। বর্তমানে চাহিদা কম থাকায় মূল্যস্ম্ফীতি কম হলেও তা আর থাকবে না। এ জন্য আগামী বছর বড় ধরনের ঘাটতি মাথায় রেখে রাজস্ব আয়, বৈদেশিক অর্থ ব্যবহারে স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় কর্মসূচি নেওয়া এবং করোনার কারণে সৃষ্টি হওয়া নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্য, খাদ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে ব্যয় সাশ্রয়ী হতে হবে।
লেখক :সাবেক লিড ইকোনমিস্ট, বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিস