বর্তমানে যে অতিমারি চলছে তা অবশ্যই জাতীয় দুর্যোগ এবং একে জাতীয়ভাবে অর্থাৎ সামগ্রিক সমাজকে নিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় চিন্তায় পুরো সমাজকে নিয়ে এই দুর্যোগ মোকাবিলার বহিঃপ্রকাশ নেই। সরকারের সঙ্গে ব্যক্তি খাত, এনজিও এবং সর্বোপরি সামাজিক শক্তির সংযোগ একত্র করে করোনা মোকাবিলার কৌশল বাজেটে উঠে আসেনি। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বাজেটকে জাতীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। সরকারের বাইরে রাষ্ট্রের আরও শক্তিকে যুক্ত করা হয়নি। এটি নতুনত্বের অভাবের একটা বড় দিক।

দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী পহেলা বৈশাখের আগে দেওয়া বক্তব্যে ৪টি উপাদানের কথা বলেছিলেন। এগুলো হলো- সরকারি ব্যয় বাড়বে, ঋণভিত্তিক প্রণোদনা দেওয়া হবে, সুরক্ষা বলয়কে সম্প্রসারণ করা হবে এবং বাজারে তারল্য সঞ্চালন করা হবে। এগুলো অত্যন্ত সঠিক। কেননা আমাদের একটি সম্প্রসারণশীল অর্থনীতিতে যেতে হবে, যার মাধ্যমে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। কিন্তু বাজেটের আর্থিক কাঠামোতে সেই অর্থে আর্থিক উত্থান নেই। এর কারণ, আমাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। ফলে আর্থিক কাঠামো সঠিক নীতি কাঠামোকে ধারণ করতে পারেনি। নীতি কাঠামো অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু আর্থিক কাঠামো তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।

তৃতীয়ত, যদি আর্থিক সামর্থ্য না থাকে তাহলে সরকার কিছু অভিনব পদ্ধতিতে তা জোগাড় করতে পারত। প্রথমে জোগাড় করতে পারত নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে অর্থাৎ তার যে রাজস্ব ব্যয় কাঠামো আছে, সেখান থেকে সাশ্রয় করার সুযোগ ছিল। যেমন- এডিপি বহির্ভূত উন্নয়ন বরাদ্দের ৫০ শতাংশই ব্যয় হয় না। এই টাকা আলগা করে নিয়ে আসা যেত। ভর্তুকি আছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ভর্তুর্কির কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা যেত। এই মুহূর্তে ফেলে দেওয়ার মতো ছিল ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভর্তুকি। এগুলো এক সময় দরকার ছিল, এখন নেই। কেননা দেশে ইতোমধ্যে উৎপাদন ক্ষমতা অলস পড়ে থাকে। এছাড়া তেল আমদানি করার খরচ কমে গেছে। ফলে বিপিসিতে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন কমে গেছে। এখানে সাশ্রয় হতে পারত।

এবার আয়-ব্যয়ের কথায় আসি। আয়ের ক্ষেত্রে পুরো আলোচনা হয় এনবিআরকে ধরে। এনবিআরের বাইরে যে ১৫ শতাংশ ( জমি, গাড়ি নিবন্ধন ইত্যাদি) রাজস্ব আছে তা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। দেশে সম্পদ বাড়ছে, আয় বাড়ছে অথচ এসব সম্পদের বিধিবিধানের ক্ষেত্রে আয় বাড়ছে না কেন? আরেকটি বিষয় হলো, রাজস্ব ব্যয়ের ৮০ শতাংশই বেতন-ভাতা, ভর্তুকি ও সুদ। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বেতনের চেয়ে ভাতা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেড়েছে। এখানে কি সামঞ্জস্য বিধানের সুযোগ ছিল না ? অন্যদিকে সুদ পরিশোধের দায় তো বেড়েই চলেছে।

ব্যয়ের ক্ষেত্রে আগের রাজস্ব এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৫ থেকে ৭ শতাংশ এদিক-সেদিক করা হয়েছে। পুরোনো কাঠামোর ওপর তা করা হয়েছে। এখানে কভিড-১৯ এসেছে উত্তর চিন্তার মতো। কভিড এসেছে সংযোজনী হিসেবে। পুরো ব্যয় কাঠামোর মধ্যে অর্গানিকভাবে আসেনি অর্থাৎ অন্তর্নিহিতভাবে স্থাপন করা হয়নি।

আগের মতোই ৫টা খাতে এডিপির ৭০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে তো স্বাস্থ্য খাত নেই। আবার বড় ৪টা প্রকল্প এডিপির ৪০ শতাংশ নিয়ে যাবে। প্রশ্ন হলো, এবার কি এগুলো পুনর্বিবেচনার সুযোগ ছিল না? স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ তো জিডিপির সেই ১ শতাংশের নিচেই রয়েই গেল। আমি মনে করেছিলাম. তেলের জন্য যে ব্যয় সাশ্রয় হবে তার পুরোটা নিয়ে আসা হবে স্বাস্থ্যের বোনাস হিসেবে। এখানে অভিনবত্ব দেখানো যেত। এডিপিতে ১৫ থেকে ২০ বছরের প্রকল্প আছে। এগুলো ফেলে দেওয়ার সুযোগ ছিল।

কভিডের পরে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের প্রয়োজন ছিল কর্মসংস্থানের ওপর নজর দেওয়া। কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আগামী কয়েক মাসে খুবই গুরুতর আকার ধারণ করবে। তৈরি পোশাকের শ্রমিকদের অনেকেই বেকার হয়ে যেতে পারেন। অনাবাসী শ্রমিকরা ফিরে আসছেন। এই সময়কালে ক্ষুদ্র পুঁজির উদ্যোক্তাদের অনেকেই দেউলিয়া হয়ে যাবেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের যারা দিন আনে দিন খায়, বাজারে তাদের চাহিদা কমে যাবে। ফলে কর্মসংস্থানের একটা বড় চিন্তা মাথার মধ্যে রাখা উচিত ছিল। আসলে কর্মঝুঁকির ক্ষেত্রে বাজেটে তেমন কিছু করা হয়নি। পুরোনো কিছু নিরাপত্তাবলয় সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজকে বাজেটবদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে অভিনব কোনো পরিকল্পনা নেই। যেমন- একটা অভিনবত্ব এমন হতে পারত যে, ওয়েবসাইট চালুর মাধ্যমে নব্য দরিদ্র ও কর্মপ্রার্থীদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা। এদের যাচাই-বাছাই করে দুই কিংবা তিন মাসের জন্য সমর্থন দেওয়া যেত। মফস্বল থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র টিউশনি করে চলত তারা কোথায় যাবে তা কি ভাবা হয়েছে? এগুলোই হলো অভিনবত্বের জায়গা।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগেও অভিনবত্ব আনা যেত। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে একটি সংহতি তহবিল গঠন করে সেখানে যে টাকা দেবে তাকে কর রেয়াত দেওয়া যেত। তাহলে বুঝতাম, ভালো এবং মন্দকে একসঙ্গে যোগ করা হয়েছে। এখন তো সেই মন্দই রয়ে গেল। সংহতি তহবিল হলে জনগণের এক ধরনের জাগরণ ও অংশগ্রহণ তৈরি হতো। স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিদিন কে কত টাকা দিয়েছে প্রতিদিন তা ওয়েবসাইটে উঠত। ওই টাকা কোথায় ব্যবহার হয়েছে তা দেখানো যেত। স্বচ্ছতার ভেতরে জনগণের অংশগ্রহণ দিয়ে একটা অন্য ধরনের কাজ করা যেত। কিন্তু তা তো দেখলাম না। বাজেট ঘাটতির বিষয়ে বলব, বৈদেশিক সহায়তার ওপর জোর দিতে হবে। ব্যাংক খাতের ওপর অত্যাচার কমাতে হবে। ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের ঋণ নেওয়ার চাপ বেশি থাকলে ব্যক্তি খাত ঠিকমতো ঋণ পাবে না। একই সঙ্গে করোনার প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হবে না।

আমার শেষ নিবেদন হলো, বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার আগে অর্থমন্ত্রী যদি দিন-তারিখ ধরে দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে বাজেট বাস্তবায়নের একটা কর্মপরিকল্পনা দেন এবং সেখানে সামাজিক নজরদারির সুযোগ করে দেন তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে। সামাজিক নজরদারির সুযোগ থাকলে স্বচ্ছতা বাড়বে। অর্থমন্ত্রী এক মাস পর পর সংসদে এই কর্মপরিকল্পনার ওপর পর্যালোচনা উপস্থাপন করবেন। গবেষণা সংস্থা, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন পক্ষ সেই তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নজরদারি করতে পারবে। শেষ কথা হলো, করোনার কারণে আমরা জাতীয় দুর্যোগের মধ্যে আছি। এই দুর্যোগকে সুযোগে পরিণত করতে হবে।

লেখক :অর্থনীতিবিদ, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো

মন্তব্য করুন