মনে হচ্ছে কভিড-১৯ পরিস্থিতি সহজে আমাদের ছাড়ছে না। করোনা সংক্রমণের সংখ্যা এখনও বাড়ছে। এ অবস্থায় অর্থনীতিও তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পেতে সময় নিচ্ছে। সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য যে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে, সেটি অর্জন করতে হলে স্বাস্থ্যসেবাকে ঠিক রেখে আমাদের আর্থিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি সচল রাখার কোনো বিকল্প নেই। এই করোনা মহামারির মধ্যে দেশে কৃষি খাত স্বাভাবিক ছিল। এটি আমাদের জিডিপির জন্য ইতিবাচক। তবে প্রবৃদ্ধির বাকি পথ অর্জন করতে হবে শিল্প ও সেবা খাতের মাধ্যমে।
করোনার কারণে দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়েছে। সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ করছে। এই খাতের অনেক কর্মী কাজ হারিয়েছেন। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটি বড় খাত হচ্ছে অপ্রতিষ্ঠানিক খাত। বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজ করছে এ খাতে। নির্মাণকর্মী, রিকশাচালক, রেস্তোরাঁ কর্মী, ফুটপাতের বিক্রেতাসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। ফলে ভোক্তা ব্যয়ও কমেছে। ভোক্তা ব্যয় অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরি করে। কিছু মানুষ এই চাহিদা পূরণের জন্য উৎপাদন ও বিপণন কাজে যুক্ত হন। তারা যে আয় করেন, সেটা আবার ভোগে ব্যয় হয়, চাহিদা তৈরি হয়। কিন্তু আয় কমে গেলে চাহিদায় প্রভাব পড়বে, সেটি স্বাভাবিক।
তবে এত কিছুর পরও আশার বাণী শোনাতে চাই যে, বর্তমানে খাদ্যপণ্যের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। এ বছর কৃষির উৎপাদন ভালো হয়েছে। এই কারোনাকালেও কৃষক মাঠে কাজ করেছেন এবং ভালো ফসল ফলিয়েছেন। এর ফলে তাদের হাতে অর্থ আসছে এবং ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। খাদ্যপণ্যের কোম্পানি হিসেবে এ ক্ষেত্রে প্রাণ ভালো করছে। আমাদের আরএফএলের ব্যবসাও এখন আস্তে আস্তে ভালোর দিকে এগোচ্ছে। এখন কিন্তু দেশের অনেক জায়গায় বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে আর্থিক কমকাণ্ড সচল হচ্ছে।
রপ্তানি খাতেও আমাদের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। যারা আগে আমাদের ক্রেতা ছিল না, তারাও চীনের পাশাপাশি অন্যান্য দেশে থেকে পণ্য কেনার কথা ভাবছে। তারা এখন বিকল্প বাজারের কথা ভাবছে। বাংলাদেশ এ সুযোগটি নিতে পারে। আমার মনে হয়, রপ্তানি বাজারে আমরা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারব। পোশাকের বাইরে অন্যান্য খাতেও রপ্তানি আয় বাড়বে। সুতরাং আমাদের রপ্তানি খাত যদি পুরো ফিরতে পারে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং সরকার যদি উন্নয়ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখে তবে আগের জায়গায় ফিরে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
করোনা মহামারির মধ্যেও সরকার আর্থিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটি খুবই সময়োপযোগী। সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তার দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়াটা জরুরি। প্রকৃত ব্যক্তিরা যেন এই প্যাকেজের আওতায় আসে তা নিশ্চিত করতে হবে। সেবা খাত ও ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তারা যেন সহায়তা পায়। যেমন- দেশের ২৫ লাখের মতো দোকান মালিক রয়েছেন, যারা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল রাখেন, তাদের প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকিং খাত এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বেসরকারি খাতকে যে প্রণোদনা দিয়েছে, তা ব্যাংকনির্ভর। ব্যাংক খাত এমন একটি খাত, যেটি সমস্যায় পড়লে দেশের পুরো ব্যবসায়িক পরিস্থিতি খারাপ হবে। কোনো অবস্থায় ব্যাংক খাতকে বিপাকে ফেলা যাবে না। তাই সরকারকে এই খাতে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে।
আমরা দেখছি, করোনা-পরবর্তী ইউরোপ ও আমেরিকা কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে দেশের অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বের হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে নিচ্ছে। আমাদের সরকারকে এখন কর্মসংস্থান তৈরিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, মানুষ কাজে ফিরলে তাদের হাতে টাকা আসবে। এ জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নতুন নতুন পণ্যে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। সরকার কৃষি খাতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি আরও বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। মানুষের হাতে নগদ টাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই আমরা করোনা মহামারি জয় করে অর্থনীতি স্বাভাবিক রাখতে পারব।
লেখক :চেয়ারম্যান ও সিইও, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ

মন্তব্য করুন