বর্তমান সংকটের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন খুবই দুরূহ কাজ। সেদিক থেকে আমি অর্থমন্ত্রীর এবারের বাজেট ঘোষণাকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখি। তবে সবার প্রত্যাশা ছিল, বাজেটে একটি চমক আসবে এবং স্বাস্থ্য খাতকে শুধু অগ্রাধিকার নয়, প্রধান উন্নয়ন বিবেচনা হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। সেই প্রত্যাশা এই বাজেট পূরণ করতে পারেনি।
আমরা দেখেছি, কভিড মোকাবিলায় ভালো করেছে অর্থাৎ মৃত্যু কম হয়েছে এবং সংক্রমণের হার বশে আনতে পেরেছে এমন দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছিল। এ ধরনের উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম কিংবা শ্রীলংকার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে যা ১ শতাংশের কম। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ কিছুটা বেড়েছে বটে। ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ যোগ করলে তা ৪০ হাজার কোটি টাকা দাঁড়ায়। কিন্তু কিছু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রত্যাশা করেছিলাম, এই বাজেটে আলাদা ডকুমেন্ট হিসেবে একটা সম্পূরক স্বাস্থ্য বাজেট থাকবে। সেখানে বরাদ্দ করা অর্থ কীভাবে খরচ হবে শুধু তা নয়, স্বাস্থ্যবিষয়ক একটা মহাপরিকল্পনা থাকবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার বর্তমান দুর্দশার কারণ হলো, বহু বছর ধরে চলে আসা পুঞ্জিভূত বিনিয়োগস্বল্পতা। সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো এক দিনে সম্ভব নয়। এর জন্য তিন বছর মেয়াদি একটা কর্মসূচি নিতে হবে, যার শুরু হতে পারত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের মাধ্যমে। প্রথম বছরে বেশ কিছু পরিবর্তন এনে পরবর্তী দুই বছরে এসব পরিবর্তনের প্রসার ঘটানো যেত।
একটা সম্পূরক দলিল প্রণয়ন এখনও সম্ভব, যা স্বাস্থ্য খাত সম্পর্কে দেশের পরিকল্পনাকে তুলে ধরবে এবং যেখানে শুধু আর্থিক বরাদ্দের নয়, পরিচালন সক্ষমতারও পরিকল্পনা থাকবে। এক্ষেত্রে দুটি জরিপ অবিলম্বে প্রয়োজন, যা বর্তমানের জোনিং পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। একটা বেজলাইন জরিপ করলে আমরা জানতে পারব, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার কেমন এবং তুলনামূলক কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। প্রতি জেলা থেকে ১ হাজার করে মোট ৬৪ হাজার নমুনা নিয়ে এই জরিপ করা যেতে পারে। এটি আগেই করা উচিত ছিল। তিন মাস আগে এই জরিপ করলে বর্তমানে বেড়ে যাওয়া সংক্রমণের এই সময়ে আমরা একটা বেজলাইন পেতাম। কিন্তু আর দেরি করা ঠিক হবে না। আগামীতে কীভাবে আমরা এই সংকট মোকাবিলা করব তার জন্য বেজলাইন জরিপ দরকার। যেমন- বস্তিবাসীর মধ্যে সংক্রমণ কেমন তা জানতে ঢাকার কুড়িল এবং কামরাঙ্গীরচরের বস্তি থেকে নমুনা নেওয়া যেতে পারে। আদিবাসী এলাকার কিছু নমুনা নেওয়া যেতে পারে। ৬৪ জেলায় ৬৪ হাজার এবং এর বাইরে বস্তি, আদিবাসী ও অন্যান্য বিশেষ ক্ষেত্র মিলিয়ে ৭০ হাজার নমুনা নিয়ে জরিপ করে দুই মাসের মধ্যে সরকারের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করা সম্ভব। এই কাজটি আইসিডিডিআরবি, আইইডিসিআর এবং বিআইডিএস সবাই মিলে করতে পারে।
দ্বিতীয় প্রস্তাবনা হলো, আমরা এখনও সম্পূর্ণভাবে জানি না যে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার জায়গা বিশেষ করে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের তুলনামূলক পরিস্থিতি কীরকম। এই পরিস্থিতি জানার জন্যও জরিপ দরকার। এই জরিপের উদ্দেশ্য হবে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ডাক্তার, নার্স প্রভৃতি জনবল, বেড, আইসিইউ, অক্সিজেন সহায়তা ইত্যাদির উপস্থিতি যথেষ্ট কিনা তা শনাক্ত করা। এই দুটি জরিপ কভিড মোকাবিলায় দিকনির্দেশনা নেবে।
এবার আসি সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ৯৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা সরকারি পেনশন এবং বৃত্তি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের যে উপবৃত্তি দেওয়া হয়, তা কারও রক্ষা করার জন্য নয়, স্কুলে আসতে উৎসাহিত করার একটা প্রণোদনা। এছাড়া সরকারি পেশাজীবীদের পেনশন এখানে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো অর্থ হয় না। এটা আপামর জনসাধারণের সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত নয়। এখন প্রশ্ন হলো, বাকি ৫০ হাজার কোটি টাকার কি যথাযথ ব্যবহার হবে। আমরা গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছি, সামাজিক সুরক্ষার অর্ধেক চলে যায় যারা দরিদ্র নয়, তাদের হাতে। কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে এখানে নতুন করে ভাবতে হবে। আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হলো, ভারতের আধার কার্ডের মতো আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্রকে হালনাগাদ করা হোক। বর্তমানে এনআইডিতে যেসব তথ্য আছে তার সঙ্গে কিছু তথ্য যোগ করা হোক। যেমন- কোনো ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট সহায়ক কর্মসূচির সুবিধাভোগী কিনা, তার পেশা কী, তার ব্যাংক হিসাব কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব আছে কিনা- এ ধরনের কিছু তথ্য যোগ করা যেতে পারে। এটা করলে একজন ব্যক্তি দুই ধরনের কর্মসূচির মধ্যে যুক্ত হতে পারবে না।
কভিড মোকাবিলায় আমাদের যে প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, তার ৪ শতাংশের মতো হলো সরাসরি আয় সহায়তা। আর বেশিরভাগই হলো ঋণ। এর একটি অংশ হলো ক্ষুদ্র উদ্যোগে সহায়তা। এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা, আগে থেকেই থাকা দরিদ্র এবং কভিডের কারণে নতুন করে যারা দরিদ্র হয়েছে, তাদেরকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হলো, তাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। সামাজিক সুরক্ষা ও শিল্পের প্রণোদনার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা দুটি। একটা হচ্ছে, তারা কোথায় আমরা জানি না এবং তাদের নগদ সহায়তা হস্তান্তরের মাধ্যম আমরা জানি না। দ্বিতীয়টি হলো, তাদের অবস্থান হালনাগাদ করার জন্য আগের ডাটাবেজ যথেষ্ট নয়। নতুনভাবে করতে হলে আমাদের স্থানীয় সরকারের সাহায্য নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হলো, স্থানীয় সরকার বলতে আমরা বুঝি ইউনিয়ন পরিষদকে। ১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ৫ হাজার ইউনিয়ন। একজন ্‌ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের জানা সম্ভব নয়, কোনো বিধবা বা কোনো বয়স্ক মানুষ এখন কী অবস্থায় আছে। আমার প্রস্তাব হলো, বর্তমানের সংকটে গ্রামকে প্রাথমিক অর্থনৈতিক ইউনিট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। তা না হলে প্রকৃত সু্ি‌বধাভোগীর কাছে আমরা সহায়তা পৌঁছাতে পারব না। আর শহরে মেয়র বা পৌরসভার চেয়ারম্যানের পরের কাঠামো কার্যত অনুপস্থিত। শহর এলাকার ওয়ার্ড ও মহল্লাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। হয়তো বলা হবে, এটি খুব তাড়াতাড়ি করা সম্ভব নয়। কিন্তু ভিশন ঠিক থাকলে এখন কাজ শুরু করে দিলে তিন বছরের মধ্যে আমরা একটা শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা পাব। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের সংকটে আমরা যথাযথভাবে মানুষকে সহায়তা করতে পারব। নইলে টাকার নয়ছয় হবে। আর টাকার নয়ছয় প্রসঙ্গে একটা কথা বলব। অনেক সময় বলা হয়, ৫ লাখ টাকা দামের ভেন্টিলেটর কিনতে খরচ হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। এ ধরনের নয়ছয় রোধের একটাই উপায় হলো, একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও স্থায়ী রেগুলেটরি কমিশন গঠন করা। প্রতিটি সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কমিশন দাম ঠিক করে দেবে।
এবার অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রসঙ্গে আসি। বাজেটে সম্ভবত ভি-আকৃতির পুনরদ্ধারের কথা চিন্তা করা হয়েছে। যেমন- ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এটি ১৩ শতাংশ রয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে যা ২৫ শতাংশে হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের হার চলতি অর্থবছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে, যার ৮ মাসই ছিল ভালো অবস্থায়। তাহলে আগামী অর্থবছরটা যেখানে অন্তত ৬ মাস বড় সংকটের মধ্যে যাবে বলে আশঙ্কা করছি, সেখানে কীভাবে এই ইউ-আকৃতির পুনরুদ্ধার হবে। ব্যাংক খাতের আলোচনা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। আইএমএফের হিসাবে এদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশের মতো এবং তা কভিড আসার আগে। এরপরও এখনও খেলাপিদের প্রশ্রয় দেওয়ার নীতি অব্যাহত রয়েছে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ব্যাংক কমিশন করা হয়নি। খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমার প্রস্তাব ছিল, ব্যাংক কমিশন করে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করে তারপর সুবিধা দেওয়া বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। আরেকটি প্রস্তাব ছিল, অবলোপন করা ঋণের ওপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। এত কথা বলার মানে হচ্ছে, ব্যাংকিং খাত যদি এমন ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে থাকে তাহলে তার মাধ্যমে বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে এত বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া এবং কভিড মোকাবিলার প্রণোদনা প্যাকেজ সরকার কীভাবে বাস্তবায়ন করবে।
সবশেষে বলব জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে। উন্নয়নের লক্ষ্য হলো, স্বাস্থ্য,শিক্ষা ও আরও উন্নততর জীবন উপহার দেওয়া। সেই উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সহায়ক হয়। সুতরাং প্রবৃদ্ধির সংখ্যার পেছনে ছোটার দরকার নেই। আগামী অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রাক্কলনে যাওয়ার দরকার ছিল না। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ যাই বলুক, চলতি অর্থবছরে যেহেতু ৮ মাস ভালো ছিল, সেহেতু প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে। তা যদি হয় তাহলে পরের বছর ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কীভাবে হবে। যদি এবার ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতো, তাহলে ৮ শতাংশের প্রাক্কলন করা যেত। দারিদ্র্যের প্রসঙ্গ দিয়েই শেষ করব। প্রাথমিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, আড়াই কোটি মানুষ নতুনভাবে দরিদ্র হচ্ছে। এখন আড়াই কোটি মানুষকে যদি এক বছর ধরে মাসে ১ হাজার টাকা দেওয়া হয় তাহলে সরকারের ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। সুতরাং প্রকৃত বরাদ্দ ৫০ হাজার কোটি টাকার (পেনশন ও বৃত্তি বাদে) সঙ্গে এই ৩০ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে সরকার একটা ভালো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দিতে পারত। এক্ষেত্রে কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে, কারণ বিপদের সময় কৃষিই সবচেয়ে ভালো সামাজিক সুরক্ষা।
লেখক :অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক




মন্তব্য করুন