করোনাভাইরাসের প্রভাব মূল্যায়ন করে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট কিছুদির পর সংশোধনের প্রস্তাব এসেছে। গবেষণা সংস্থা সিপিডি আয়োজিত ওই সভায় বক্তাদের অনেকেই বলেছেন, এই সংশোধন হতে পারে তিন বা ছয় মাস পর। কভিড মোকাবিলার প্রণোদনা প্যাকেজ এবং বাজেটের উদ্যোগ বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় একটি টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শও এসেছে। যদিও ওই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, বাজেট নিয়মিত সংশোধন হয়। কোথাও কোনো বরাদ্দ কমানো বা বাড়ানোর প্রয়োজন হলে তা করা হবে। 

শনিবার সেন্টার ‘সিপিডি বাজেট সংলাপ -২০২০’ শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ও মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু মেগা প্রকল্প নিছক টাকার প্রকল্প নয়। প্রত্যেকটি প্রকল্প অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। কৃষি, প্রবাসী আয়, রিজার্ভ ও গ্রামীণ অর্থনীতি ভালো থাকায় উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির আশা করা হচ্ছে। 

অনুষ্ঠানের সভাপতি সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, সবচেয়ে জরুরি হলো বাজেট বাস্তবায়ন। কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। প্রণোদনা প্যাকেজ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য সেবা লক্ষ্য অনুযায়ী এগোচ্ছে কি না পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এজন্য সরকারি, বেসরকারি ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

মূল প্রবন্ধে সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, করোনাভাইরাস দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে এবং অর্থনীতি ঘুরে দাড়াবে এমন ধারণা থেকে সরকার বাজেট করেছে। সরকার স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও কর্মসংস্থান বিষয়ে গুরুত্ব দিলেও তা যথেষ্ট নয়। নতুন দরিদ্র্য এবং আয় ও ভোগ বৈষম্য কমাতে বাজেটে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। 

বন ও পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, বাজেটের বরাদ্দ ব্যবহারের ফলে সেবার মানে কী পরিবর্তন হচ্ছে এবং কেন সংস্থাগুলোর দক্ষতার উন্নয়ন হচ্ছে না তা পর্যালোচনা করতে হবে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো মানুষকে  বাঁচানো এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। বাজেটে এসব বিষয় নিয়ে উদ্যোগ আছে।  এখন যে পরিস্থিতি তাতে প্রতি দুই মাস অন্তর বাজেট পর্যালোচনা করা দরকার। 

সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, করোনার আগেই আমদানি-রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ নিম্নমুখী ছিল। করোনা সংকট ও আগের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাজেট হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের দক্ষতা বাড়ানো ও জবাবদিহিতা নিয়ে বাজেটে কোনো বক্তব্য নেই। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে অনেক বড় অংকের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এতে ব্যক্তি খাতে ঋণ কমবে।  

সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান মাথায় রেখেই সরকার কাজ করছে। এখন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার। ছয় মাস পর পরিস্থিতি দেখে বাজেট সংশোধন করা যেতে পারে। বহুমুখীকরণ, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সরকারি ব্যয়েও বহুমুখীকরণ করতে হবে। জবাবদিহিতা দরকার। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ বছর ধারাবাহিক বাজেটের পরিবর্তে করোনাভাইরাসের প্রভাব ও পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বাজেট করা উচিত ছিল। এক বছরে হয়ত এই প্রভাব মোকাবিলা সম্ভব নয়। ব্যাংকের মাধ্যমে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কিন্তু ব্যাংকের সংস্কার উদ্যোগ নেই। এনবিআরেরও সংস্কার দরকার। এডিপি এত বড় না করলেও চলতো। এখনও সময় আছে, আরেকটু বাস্তবসম্মত করা যেতে পারে। আয় ও সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এমন উন্নয়ন কৌশল নিতে হবে। 

পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, বার্ষিক বাজেট দরকার ছিল না। ছয় মাসের দুটো অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট করা উচিত ছিল। সেখানে ভাইরাস প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান এবং প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ থাকবে। এ বছর রাজস্ব আয় কর জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশ হবে। এতে সরকার চলতে পারবে না। রাজস্ব আয় বাড়াতেই হবে। নতুবা টাকা ছাপিয়ে বেতন দিতে হবে। 

তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের বাস্তবচিত্র হলো, এটি  অনেক বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে কমেছে। গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ করছে না। এখনও সময় আছে। আর্থিক খাতে সংস্কার দরকার।

এসসিসিআই সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির বলেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ, ভালো ঋণ গ্রহীতার সুদের ১০ শতাংশ রিবেট প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপে প্রমানিত হয়েছে, বাংলাদেশ সৎ উপায়ে ব্যবসা করার জায়গা নয়। তিনি তিন মাস পর বাজেট সংশোধনের প্রস্তাব করেন। 

বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির মোবাইলের ওপর অতিরিক্ত সম্পূরক শুল্ক বাতিল এবং ইন্টারনেট থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, শহরের তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রণোদনায় অন্তর্ভূক্ত করা, অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজের সুবিধা বাড়ানো এবং সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রাপ্তি সহজ করার  প্রস্তাব করেন। 

বাংলাদেশ এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থানে আরও গুরুত্ব দরকার। দুঃস্থ নাগরিকদের নগদ টাকা দেওয়া দরকার। কর্মসংস্থানের জন্য দেশে চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে। 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা ও  কর্মহীন নারীর জন্য বাজেটে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা নেই। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও  সহিংসতা রোধে পদক্ষেপ নেই। 

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।  সাবেক অতিরিক্ত সচিব জালাল আহমেদ, বিল্ডের সিইও ফেরদৌস আরা বেগম, গণস্বাক্ষরতা অভিযানের উপ পরিচালক কে এম এনামুল হক, অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের নাজমুল আহসান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। 

মন্তব্য করুন